ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ যতো এগিয়ে আসছে, নির্বাচনী আড্ডা ততই জমে উঠেছে। তবে সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে যতটা আগ্রহী, তারচে কয়েকগুণ বেশী আগ্রহী বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে চলছে আলোচনা বিচার বিশ্লেষণ। সিলেটের ৬টি আসনও এমন আলোচনার বাইরে নয়।
সেই ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ বা ২০০৮ সালের মতো এবারের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ জনগনের মধ্যে এখনো তেমন একটা মাতামাতি নেই। কারণ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নেই বা তারা অংশগ্রহণ করতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদেরও তেমন একটা আগ্রহ নেই, মাতামাতিরতো প্রশ্নই উঠেনা।
আর তাই ‘গ্রামীন সংসদ খ্যাত’ সিলেটের চা’র দোকানগুলোতে নির্বাচনী আড্ডায় যারা মেতে উঠছেন তারা হয় বিএনপির কর্মী সমর্থক বা জামায়াতের। তাদের আলোচনার বিষয়বস্তুও তাই বিভিন্ন আসনে এ দুই দলের প্রার্থীদের নিয়ে। কে কোন আসনে কেমন করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি।এবার সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আর জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের পিতা এ আসনের সাবেক এমপি। ব্যক্তিগত এবং দল মিলে এ আসনটিতে বিএনপির ভোট প্রচুর। সে তুলনায় জামায়াতের ভোট এ আসনে কোনোদিনই খুব বেশী ছিলনা। ২৪ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলটির ভোট কিছুটা বাড়লেও তাতে এ আসনে বিএনপির সঙ্গে তাদের পেরে উঠাতো বহুদূর, কারও কারও মতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবেনা।মুক্তাদিরের আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার পর সিলেট-১ আসনে আর কোনো দলীয় সমস্যা নেই।নগরীর কাজিরবাজার এলাকার একটি চার দোকানে এমন বিশ্লেষণই দিলেন কয়েকজন নাগরিক।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নিখোঁজ বিএনপি নেতা ও সাবেক সাংসদ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা। ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পর থেকেই তিনি রাজনীতির মাঠে আছেন। এ আসনে ইলিয়াসের জনপ্রিয়তা যেমন তার জন্য একটা বিশাল ব্যাপার, তেমনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার নিজের রাজনৈতিক তৎপরতায় তার অবস্থান অনেকটাই সুসংহত।
এ অবস্থায় এ আসনটিতে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সিলেট জেলা জামায়াতের শুরু সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠতে পারে বলে কেউই মনে করছেন না।
ওসমানীনগর এলাকার কৃষক আব্দুল মজিদ (৪৫) বিষয়টি নিয়ে আলপকালে বলেন, এখানে ইলিয়াস আলী বা তার স্ত্রীর কোনো বিকল্প আছে বলে আমি মনে করছিনা। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এমএ মালিক। আর জামায়াতের প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ।
স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে লোকমান জিতে যেতে পারেন। কারণ, আসনটিতে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এমএ সালাম। আবার জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও এখানে বেশ জনপ্রিয়। তিনিও মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাদের মনোনয়ন না দিয়ে দেওয়া হয়েছে এমএ মালিক কে। সালাম-কাইয়ুমের তুলনায় মালিক নির্বাচনী মাঠে একেবারেই নতুন। এ অবস্থায়, দলীয় কোন্দলের বিষয়টি প্রকাশ্যে না এলেও সালাম ও কাইয়ুমের সমর্থকরা কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। সেই হিসাবে তাদের ভোট মালিকের ধানের শিষে নাও পড়তে পারে। আর এটাই সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জামায়াতের প্রার্থী লোকমানের জন্য হতে পারে পোয়াবারো।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ-জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট) এ আসনে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। আর তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদিন। দু’জনেই ঘাঘু রাজনীতিবিদ।
জয়নাল একবার জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যানও ছিলেন। এ আসনে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছিলেন আরেক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গোয়াইনঘাটের আব্দুল হাকিম চৌধুরী। তিনি এবার মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শুরুর দিকে কিছুটা বিদ্রোহের শঙ্কা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত আরিফকেই সমর্থন দিয়েছেন। সেই হিসাবে আরিফের ধানের শিষ বাতাসে দোল খেতে শুরু করেছে বলেও মনে করছেন অনেকে। তবে জয়নাল আবেদিনেরও ভোট কিন্তু নেহায়েত কম নয়। স্থানীয় ইস্যু কাজে লাগিয়ে প্রচারণার কৌশল নিয়েছেন তিনি। আর তাই এ আসনে লড়াই হওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। তবে এখানে কিন্তু আরিফের পথের কাঁটা হতে পারেন বিএনপি নেতা হেলাল উদ্দিন আহমদ। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন বলেই ধারনা প্রবল। আর তাহলে কিন্তু আরিফ-জয়নাল লড়াই আরও তীব্র হতে পারে।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে বিএনপি দলীয় কোনো প্রার্থী দেয়নি। সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুক কে। তবে এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন, তিনি মামুনুর রশীদ বা চাকসু মামুন। সিলেট জেলা বিএনপির প্রথম সহ সভাপতি মামুন এবার খুবই আশাবাদী ছিলেন মনোনয়নের ব্যাপারে। কিন্তু দলীয় আসন সমঝোতার বলি হওয়ার বিষয়টি তিনি ও তার কর্মী সমর্থকরা মেনে নিতে পারছেন না। তাই তিনি নির্বাচনী মাঠে থাকবেন। তবে এ আসনে জমিয়তের অবস্থান বেশ শক্ত। সে হিসাবে এ আসনে মামুন- উবায়দুল্লাহ ফারুকের লড়াই জমে উঠতে পারে বলে ধারনা দিয়েছেন কয়েকজন ভোটার। আর জামায়াত মনোনীত প্রার্থী দলটির জেলা শাখার নায়েবে আমীর আনোয়ার হোসেন খান ভোটের মাঠে কাজ করলেও খুব একটা আলোচনায় কিন্তু নেই তিনি।
সিলেট-৬ ( গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে বিএনপির প্রার্থী সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী ঢাকা উত্তর জামায়াতের আমীর সেলিম উদ্দিন। এ আসনেও বিএনপির অভ্যন্তরিন সমস্যা প্রচুর। যেমন, দীর্ঘদিন থেকে এখানে কাজ করছিলেন ২০১৮ সালে দলের মনোনয়ন পাওয়া সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ফয়সল আহমদ চৌধুরী। কিন্তু এবার মনোনয়ন দেওয়া হয়নি তাকে। স্বাভাবিকভাবে তার কর্মী-সমর্থকরা আশাহত। তাদের সমর্থন এমরান পাবেন কি না, সেটা নিয়েও চলছে তুমুল বিতর্ক, আলোচনা সমালোচনা।এদিকে আবার সেলিম জামায়াতের বড় নেতা হলেও এ আসনে তার খুব একটা পরিচিতি ছিলনা। বিশেষ ২০২৪ এর ৫ আগস্টের আগে অন্তত গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারের রাজনীতিতে তাকে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তীতে তিনি বেশ কাজ করছেন। গোটা নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। সেই হিসাবে তার সম্ভাবনা কেউ কেউ দেখলেও বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটের মাঠে থাকলে লড়াই হাড্ডাহাড্ডিই হবে বলে ভোটারদের ধারনা।