নিউজ ডেক্স:
ছেলের বিয়ের আয়োজন করতে দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরছিলেন বাবা ও ছেলে। হাতে ছিল ফেরার টিকিট, বাড়িতে চলছিল তাদের আগমনের অপেক্ষা। স্বজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বিমানবন্দরে রিসিভ করতেও বলেছিলেন তারা। পরিবারের সদস্যদের মনে ছিল আনন্দের বন্যা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো কান্নায়।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই সৌদি আরবে সড়কে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন কানাইঘাট উপজেলার দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের লামার তালুক গ্রামের দুই প্রবাসী আব্দুল করিম ও খালেদ আহমদ।
একই দুর্ঘটনায় আরও দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পাশাপাশি দুটি বাড়িতে এখন চলছে কান্নার রোল।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের তায়েফ থেকে দেশে ফেরার জন্য বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী। পথিমধ্যে আল খুরমা এলাকায় তাদের বহনকারী গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে দুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটি। দুর্ঘটনায় কানাইঘাট উপজেলার আব্দুল করিম ও খালেদ আহমদসহ চার বাংলাদেশি নিহত হন। নিহত অন্য দুজন হলেন কুমিল্লার শাহ আলম ও সুনামগঞ্জের আমিন উদ্দিন।
নিহত আব্দুল করিমের বয়স প্রায় ৫০ বছর। তিনি দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছিলেন। তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক আব্দুল করিম কয়েক বছর আগে তার এক ছেলেকে সৌদি আরবে নিজের কাছে নিয়ে যান।
সোমবার সেই ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই দেশে ফিরছিলেন তিনি। দেশে ফেরার অন্যতম কারণ ছিল ছেলের বিয়ের আয়োজন। দীর্ঘদিন পর বাবা-ছেলের বাড়ি ফেরাকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের আমেজ বিরাজ করছিল। বিয়ের প্রস্তুতি ও প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল পুরো পরিবার। সোমবার বাবা ও ছেলে পরিবারের সদস্যদের ফোন করে বিমানবন্দরে তাদের রিসিভ করতে বলেছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই তছনছ করে দেয় পরিবারের সব স্বপ্ন। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িতে আব্দুল করিমের ছেলে মোহাম্মদও ছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণে রক্ষা পান। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় তায়েফের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নিহত খালেদ আহমদের বাড়িও আব্দুল করিমের বাড়ির পাশেই। প্রায় ৬০ বছর বয়সী খালেদ আহমদ দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছিলেন। পেশায় তিনি ছিলেন গাড়িচালক। তার চার ছেলে ও চার মেয়ে সন্তান রয়েছে। প্রবাসে যাওয়ার পর তার এক কন্যাসন্তানের জন্ম হলেও সেই মেয়েকে তিনি কখনো নিজ চোখে দেখার সুযোগ পাননি। সর্বশেষ ঈদুল আজহায় তিনি দেশে এসেছিলেন।
এরপর আবার কর্মস্থলে ফিরে যান সৌদি আরবে। সোমবার নিজের গাড়িতে করে কয়েকজন প্রবাসীকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন খালেদ আহমদ। আল খুরমা এলাকায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তার সন্তান ও স্বজনরা। যে বাবা দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন নিয়ে পথ চলছিলেন, তার সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। একই গ্রামের পাশাপাশি দুটি বাড়িতে এখন নেই কোনো আনন্দের প্রস্তুতি, নেই প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা; আছে শুধু কান্না আর আহাজারি।
এদিকে সৌদি আরবের তায়েফ থেকে জেদ্দা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় চারজন বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক শোকবার্তায় বিষয়টি জানানো হয়। শোকবার্তায় তারা জানান, সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে নিহতদের বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুন মাসে কাতারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসীর মৃত্যু হয়। সেই শোকের রেশ কাটতে না কাটতেই পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবে আরও একজন কানাইঘাট প্রবাসীর মৃত্যু হয়। এরই মধ্যে আবারও সৌদি আরবের সড়ক দুর্ঘটনায় কানাইঘাটের দুই প্রবাসীর প্রাণহানিতে এলাকায় নতুন করে শুরু হয়েছে শোকের মাতম।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আব্দুল খালিক
আইন-উপদেষ্টা: ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
উপ-সম্পাদকঃ ফুজেল আহমদ
সহ সম্পাদকঃ মোঃ সুমন আহমদ
সার্বিক ব্যবস্থাপকঃ মোঃ আলী হোসেন
স্টাফ রিপোর্টারঃ মোঃ আবুল হাসান আহমদ,
প্রকাশক কর্তৃক উত্তরা অফসেট প্রিন্টার্স কলেজ রোড, বিয়ানীবাজার
সিলেট থেকে মুদ্রিত ও শরীফা বিবি হাউজ, মেওয়া থেকে প্রকাশিত।
বানিজ্যিক কার্যালয় :
উত্তর বাজার, মেইন রোড, বিয়ানীবাজার, সিলেট।
ই-মেইল: beanibazareralo@gmail.com
মোবাইল: ০১৮১৯-৫৬৪৮৮১, ০১৭৩৮১১৬৫১২।