Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নকল রুখতে শিক্ষামন্ত্রীর ফের ‘হেলিকপ্টার মিশন’

admin

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
নকল রুখতে শিক্ষামন্ত্রীর ফের ‘হেলিকপ্টার মিশন’

Manual8 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

Manual7 Ad Code

আসন্ন এসএসসি-এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নকল ও অনিয়ম প্রতিরোধে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এবারের পরীক্ষার সবচেয়ে আলোচিত ও আতঙ্কের বিষয় হতে যাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীর এই ‘হেলিকপ্টার মিশন’।মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম রুখতে এবার প্রথাগত সড়কপথের পরিবর্তে আকাশপথকে বেছে নিয়েছেন মন্ত্রী। মূলত সড়কপথে পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় প্রশাসন বা কেন্দ্র সচিবরা আগেভাগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পান, যা ঝটিকা অভিযানের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। সেই ছিদ্রপথ বন্ধ করতেই পুনরায় এই ‘হেলিকপ্টার মিশন’ পরিকল্পনা করা হয়েছে।মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মন্ত্রী কোনো পূর্বনির্ধারিত সূচি ছাড়াই ঢাকার তেজগাঁও বা নিকটস্থ হেলিপ্যাড থেকে যেকোনো মুহূর্তে উড়াল দেবেন। আকাশপথের দ্রুতগতির কারণে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারবেন। এর মূল লক্ষ্য হলো— কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম বা নকলের খবর পাওয়ামাত্রই সেখানে অতর্কিত অভিযান চালানো।এবারের মিশনে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে দেশের দুর্গম চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং পাহাড়ঘেরা কেন্দ্রগুলোকে। ইতিপূর্বে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় এসব কেন্দ্রে মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগত, যা অসাধু ব্যক্তিদের সুযোগ করে দিত। এবার মন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে এমন কিছু ‘রেড জোন’ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে যেকোনো সময় আকাশ থেকে হেলিকপ্টার অবতরণ করবে।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নজরদারির একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থাকবে। কোনো কেন্দ্রের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়ার অর্থই হলো— শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে একটি সতর্কবার্তা পৌঁছানো যে, ‘শিক্ষামন্ত্রী পাশেই আছেন’।

মন্ত্রীর এই মিশনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে বিশেষ ‘লাইভ মনিটরিং’ সিস্টেম। যদি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অস্বাভাবিক গতিবিধির সংকেত পাওয়া যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য হেলিকপ্টারে থাকা মন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর কোনো বিলম্ব ছাড়াই হেলিকপ্টার সেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ডাইভার্ট করবে।

Manual3 Ad Code

শিক্ষামন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই প্রক্রিয়াটি তদারকি করবেন এবং কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে সেখানেই তাৎক্ষণিক বরখাস্ত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেবেন।একইসঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ও ডিজিটাল জালিয়াতি রুখতে নিরাপত্তার জাল বিছিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিজি প্রেসসহ প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও বিতরণের প্রতিটি পয়েন্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

ভেন্যু কেন্দ্রে নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ

এবারের পরীক্ষায় বড় একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হলো— কোনো ‘ভেন্যু কেন্দ্রে’ পরীক্ষা নেওয়া হবে না। শুধুমাত্র মূল কেন্দ্রগুলোতেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, যাতে তদারকি করা সহজ হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভেন্যু কেন্দ্রগুলো মূল কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় সেখানে স্থানীয় প্রভাব বা অব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকে। এই সুযোগটি এবার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানীর কেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে, যারা সার্বক্ষণিক টহলে থাকবে।পরীক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং খবর হলো, এবার খাতা মূল্যায়নে কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা ‘অনুকম্পার নম্বর’ দেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীরা যা লিখবে, ঠিক তার ভিত্তিতেই নম্বর পাবে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ করাতে পরীক্ষকদের নমনীয়তা প্রদর্শনের যে অলিখিত সুযোগ ছিল, তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এছাড়া পরীক্ষায় শুধু শিক্ষার্থী নয়, দায়িত্বরত শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপরও থাকছে কঠোর বিধিনিষেধ। কোনো কেন্দ্রে নকল বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধুমাত্র পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়িত্ব পালনে সামান্যতম অবহেলা বা স্থানীয় কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করলে তাদের চাকরিগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।

Manual6 Ad Code

দেশজুড়ে কৌশলের জাল

সারাদেশে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করার চিন্তাও করা হচ্ছে। যেখান থেকে দেশের প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সন্দেহভাজন চক্রের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হবে। বিশেষ করে প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে যারা অর্থ হাতিয়ে নেয়, তাদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। সার্বিক বিষয়ে শনিবার (১৪ মার্চ) শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন নিয়ে কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নই। এইচএসসি পরীক্ষা হবে সম্পূর্ণ নকলমুক্ত এবং প্রশ্নাতীত। যারা মনে করছেন দুর্গম অঞ্চলে বা ঢাকার বাইরের কেন্দ্রে বসে অনিয়ম করবেন, তাদের জন্য আমার স্পষ্ট বার্তা— আমি নিজেই আসছি। যেকোনো মুহূর্তে, কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই আমি হেলিকপ্টার নিয়ে আপনাদের কেন্দ্রের মাঠে হাজির হব। আকাশপথের এই নজরদারি কেবল পরিদর্শনের জন্য নয়, বরং অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি জিরো টলারেন্স বার্তার প্রতিফলন।’

Manual1 Ad Code

খাতা মূল্যায়ন ও গ্রেস মার্ক প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “শিক্ষার্থীদের মাঝে গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে মূল্যায়নে স্বচ্ছতা জরুরি। এবার থেকে খাতায় কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা অনুকম্পার সুযোগ থাকবে না। ছাত্রছাত্রীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাবে তারা। আমরা চাই মেধার প্রকৃত লড়াই হোক। কোনো ধরনের দয়া বা দাক্ষিণ্য দেখিয়ে অযোগ্যদের পার করে দেওয়ার সংস্কৃতি আমরা বন্ধ করতে চাই।”

কেন্দ্র কর্মকর্তাদের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পরীক্ষা কেন্দ্রের পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্র সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। যদি কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে কেবল পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়, কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আমরা কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেব। বিজি প্রেস থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ আমাদের কড়া নজরদারি থাকবে।’

শেয়ার করুন