Beanibazarer Alo

  সিলেট     শনিবার, ২৭শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৩ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমরা কি প্রশ্নচিহ্ন হইয়াই থাকিব?

admin

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ০২:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ০২:৩৮ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
আমরা কি প্রশ্নচিহ্ন হইয়াই থাকিব?

Manual1 Ad Code

সম্পাদকীয় :
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত। ইতিহাসের বিচারে ইহা নিতান্ত অল্প সময় নহে। অনেক জাতি এই সময়ের মধ্যেই নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুসংহত করিয়াছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নাগরিক চরিত্র গড়িয়া তুলিয়াছে, আত্মমর্যাদাবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়াছে। অথচ বাংলাদেশকে দেখিলে মনে প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সত্যিই একটি সুসংহত ‘জাতি’ হইয়া উঠিতে পারিয়াছি? নাকি আমরা এখনো কেবল একটি জনসমষ্টি, যাহার রাষ্ট্র আছে, পতাকা আছে, সংবিধান আছে-কিন্তু জাতিগত চরিত্র গঠনের জায়গায় রহিয়াছে এক দীর্ঘ অপূর্ণতা?

আজকের বাংলাদেশে দাঁড়াইয়া এই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নহে। কারণ, রাষ্ট্রের ভিতরে ও বাহিরে যাহা ঘটিতেছে, তাহা এই মৌলিক জিজ্ঞাসাকেই বারংবার সম্মুখে আনিতেছে। বিদেশে হইতে লোক আসিয়া উপদেশ দিতেছে। বিভিন্ন নীতিমালা, কাঠামো, কমিশন, পরিকল্পনার কথা উঠিতেছে। কিন্তু মাঠের চিত্র কি বদলাইতেছে? নাকি আমরা সেই একই বৃত্তে ঘুরিতেছি-নূতন শব্দ, পুরাতন অভ্যাস-নূতন মুখ, পুরাতন মানসিকতা?

Manual5 Ad Code

এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করিতে গেলে প্রথমেই বুঝিতে হইবে- ‘জাতি’ বলিতে আমরা কী বুঝি। একটি জনগোষ্ঠী কেবল একই ভৌগোলিক সীমার মধ্যে বাস করিলেই জাতি হয় না। একই ভাষা বা একই ইতিহাস থাকিলেই জাতি গঠিত হয় না। জাতি হইতে হইলে প্রয়োজন একটি সম্মিলিত নৈতিক বোধ, একটি অভিন্ন দায়বদ্ধতা, এবং সর্বোপরি একটি আত্মসম্মানবোধ-যাহা কেবল ব্যক্তিগত নহে, সামষ্টিক। জাতি হইবার অর্থ, আইনকে কেবল ভয়ের বস্তু না ভাবিয়া ন্যায়ের প্রকাশ রূপে মান্য করা। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু উদাহরণ রহিয়াছে, যেইখানে স্বাধীনতা অর্জন ‘জাতি’ গঠনের নিশ্চয়তা দেয় নাই। আফ্রিকার বহু রাষ্ট্র-কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া-দীর্ঘকাল স্বাধীন-কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো থাকিলেও জাতিগত সংহতি গড়িয়া উঠে নাই। লাতিন আমেরিকার কিছু দেশেও দেখা যায়-নির্বাচন হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু নাগরিক আচরণে শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অভাব ঘুচে না। আবার বিপরীত দৃষ্টান্তও রহিয়াছে-দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, এমনকি ধ্বংসস্তূপে দাঁড়ানো জার্মানি-যেইখানে নাগরিক চরিত্র গঠনের প্রশ্নটিকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের কেন্দ্রে রাখা হইয়াছিল।

Manual2 Ad Code

তাহা হইলে প্রশ্ন উঠে-এই জাতি গঠনের মৌল উপাদানগুলি কী? প্রথমত, শিক্ষা-কিন্তু কেবল ডিগ্রি উৎপাদনের শিক্ষা নহে। নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও যুক্তিবোধ গঠনের শিক্ষা। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান-কারণ বেকার ও অনিশ্চিত মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের মনে করিতে পারে না, সে কেবল সুযোগ খোঁজে। তৃতীয়ত, আদর্শগত জায়গায় রাজনীতিতে মতভেদ থাকিবে, কিন্তু একে-অপরকে নির্মূল করিবার হীন মানসিকতা থাকিবে না। চতুর্থত, পরিবার ও সমাজের সততা ও নৈতিকতার শিক্ষা। এইখানে আসিয়াই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলি জটিল হইয়া উঠে। আমাদের সমাজ কি দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করিতেছে, নাকি ‘চালাক’ মানুষকে পুরস্কৃত করিতেছে? জাতি গঠনের কাজ কি আমদানিযোগ্য? নাকি ইহা মূলত আত্মজিজ্ঞাসার ফল? যেই সমাজ নিজের ব্যর্থতার দায় নিজে লইতে শিখে না, সেই সমাজ কি কখনো পরিণত জাতি হইতে পারে?

Manual7 Ad Code

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলিতেছে-আমরা রাষ্ট্র গড়িয়াছি, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তা এখনো দুর্বল আমরা আন্দোলন করিতে জানি, কিন্তু প্রতিষ্ঠান গড়িতে জানি কি? সাড়ে পাঁচ দশক পর এইখানে দাঁড়াইয়া হয়তো সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি এই-আমরা কী হইতে চাই? কেবল একটি রাষ্ট্রের নাগরিক, নাকি একটি যথা অর্থে ‘জাতি’? যদি জাতি হইতে চাই, তাহা হইলে কি আমরা সেই মূল্যবোধগুলি চর্চা করিতে প্রস্তুত, যাহা একটি জনগোষ্ঠীকে জাতি হিসাবে গড়িয়া তোলে? নাকি আমরা আরো কয়েক দশক পরেও বলিব-সময় পাই নাই, সুযোগ পাই নাই, কেহ গড়িয়া দেয় নাই?

ইতিহাস অপেক্ষা করে না। যেই জনগোষ্ঠী নিজেকে যথার্থ ‘জাতি’ হিসাবে গড়িতে দেরি করে. ইতিহাস তাহাকে কেবল একটি দীর্ঘ প্রশ্নচিহ্নে পরিণত করিয়া রাখে। সুতরাং শেষ প্রশ্ন এই যে, আমরা কি তাহা হইলে সপ্তর্ষিমণ্ডলের মতো প্রশ্নচিহ্ন হইয়াই মহাকাশে ও মহাকালে ঝুলিয়া থাকিব? নাকি একদিন নিজেরা একটি চমৎকার উত্তর হইয়া উঠিব?

Manual3 Ad Code

শেয়ার করুন