Beanibazarer Alo

  সিলেট     বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমানকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়

admin

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৬:০৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ | ০৬:০৬ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
তারেক রহমানকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়

Manual8 Ad Code

মতিউর রহমান চৌধুরী:
সামপ্রতিক এক অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ১/১১-এর সময় ২০০৭ সনের ৭ই মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে। কারা গ্রেপ্তার করেছিলেন, কীভাবে করেছিলেন তার একটি বয়ান রয়েছে প্রাপ্ত অনুসন্ধানে।

Manual4 Ad Code

এতে জানা যায়, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে কর্নেল (অব.) ইমরান মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাকে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট
ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে যান। জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিনের উপস্থিতিতে আর্মি হেড কোয়ার্টারে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

মেজর ইমরানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন রানার ও একজন ড্রাইভার নিয়ে তিনি মইনুল হোসেন রোডস্থ খালেদা জিয়ার বাসভবনে উপস্থিত হন। এ সময় বাসভবনের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি ছিল। মেজর ইমরান বাসভবনের মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে বাড়ির ভেতরে নিজ গাড়িতেই অবস্থান নেন।

আনুমানিক তিন ঘণ্টা পর তারেক রহমান বাসভবন থেকে বের হলে মেজর ইমরান তাকে নিয়ে গাড়িতে উঠেন। নিয়ে যান নির্ধারিত গন্তব্যে। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মেজর ইমরানের সঙ্গে থাকা রানার তারেক রহমানের মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। এ সময় তারেক রহমান জানালা খোলার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মেজর ইমরান তা নাকচ করে দেন।

এরপর সিটিআইবি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তারেক রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। সিটিআইবি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার নির্দেশেই অন্য কর্মকর্তারা বিশ্রী ভাষায় তারেক রহমানকে গালিগালাজ করেন। জেআইসিতেই তারেক রহমানকে তিন-চারদিন রাখা হয়। সেখানে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বেঁধে রাখা হয়। হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করা হয়। দীর্ঘসময় একটানা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। যা ছিল অমানবিক, বর্বরোচিত।

তারেক রহমানকে দুইবার জেআইসিতে আনা হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে টানা কয়েকদিন জেআইসিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুর রব খান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের নির্দেশে তারেক রহমানের কাছ থেকে একটি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যে জবানবন্দিতে তারেক রহমান তার ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান বলে দাবি করা হয়।

Manual5 Ad Code

এই সময় কারা কারা উপস্থিত ছিলেন সেই তথ্যও বেরিয়ে এসেছে সামপ্রতিক এক অনুসন্ধানে। চারজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা সারাক্ষণ উপস্থিত থেকে এই জবানবন্দি আদায় করেন। এর মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাহিদ হোসেন ও মেজর (অব.) মনির। নির্যাতন চালিয়ে তারেক রহমানকে অনেকটা পঙ্গু করে ফেলা হয়।

স্বাভাবিকভাবেও তিনি হাঁটাচলা করতে পারতেন না। তার ওপর নির্যাতনের একটি কাহিনী অনুসন্ধানী রিপোর্টে সন্নিবেশিত রয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ সম্পর্কে একটি জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে তারেক রহমানের নানি মারা যান। এ সময় তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। সে সময় জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেন, তারেক রহমান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। তখন তিনি জানার চেষ্টা করেন- কীভাবে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।

Manual6 Ad Code

পারিবারিক যোগাযোগের মাধ্যমে জানতে পারেন ডিজিএফআই-এর অফিসাররা তার ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন। এতে তিনি বিচলিত হয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের কাছে জানতে চান- কেন এই নির্যাতন চালানো হয়েছে। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

জেনারেল মাসুদ তার জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার অনেক দূরত্ব তৈরি হয়। নির্যাতনের সময় তারেক রহমানকে কীভাবে রাখা হয়েছিল তার একটা বর্ণনা পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের নির্দেশে এই নির্যাতন চালানো হয়। তার নির্দেশে তারেক রহমানকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

ওয়ারেন্ট অফিসার ফজলু জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ব্রিগেডিয়ার আমিন তাদেরকে বলেছেন- পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ঝুলন্তই থাকবে। এক পর্যায়ে সিলিং থেকে তিনি পড়ে যান এবং কোমরে প্রচণ্ড আঘাত পান। বছরের পর বছর তারেক রহমানকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। এসব ঘটনায় সাত পদস্থ সেনা কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে অনুসন্ধানে।

Manual1 Ad Code

এই অফিসাররা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন (তৎকালীন সিটিআইবি’র পরিচালক), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী (তৎকালীন সিটিআইবি’র পরিচালক), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস সিটিআইবি), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আফজাল নাছের চৌধুরী (তৎকালীন জেএসও-এক), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান (তৎকালীন জেআইসি অধিনায়ক সিটিআইবি), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. ফরিদ উদ্দিন (তৎকালীন জেএসও-১) এবং মেজর (অব.) মনির (তৎকালীন জেএসও-২, সিটিআইবি)।

জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেছেন, তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। জেনারেল মইন তাকে অন্যত্র পোস্টিং দিয়েছিলেন। পিএসও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তারেক রহমান তার নিকটাত্মীয় বলে জেনারেল মইন তাকে দূরে রেখেছিলেন- এটাও দাবি করেছেন জেনারেল মাসুদ। তারেক রহমানের সঙ্গে জেনারেল মাসুদের কেন দূরত্ব তৈরি হয়েছিল তারও বর্ণনা দিয়েছেন জিজ্ঞাসাবাদে। বলেছেন, অপারেশন ক্লিন হার্টকে কেন্দ্র করেই এই দূরত্ব তৈরি হয়।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তারেক রহমানকে বলপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। এর আগে একটি অঙ্গীকারপত্র সই করিয়ে নেয়া হয়।

শেয়ার করুন