Beanibazarer Alo

  সিলেট     শনিবার, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘দালাল আমাদের খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছে না, বড় কষ্টে আছি, দোয়া করিও’

admin

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০১:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০১:১২ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
‘দালাল আমাদের খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছে না, বড় কষ্টে আছি, দোয়া করিও’

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক:
পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে অনেক স্বপ্ন আর আশা নিয়ে জীবনবাজি রেখে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাঁচ যুবক। স্বপ্নের ইউরোপের দেশ গ্রিসে আর যাওয়া হলো না তাদের। লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে তাদের মৃত্যু হয়। সাগরে এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনায় তাদের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। পাঁচ যুবকের এ করুণ মৃত্যুতে শুধু পরিবার লোকজন কিংবা স্বজনরাই নয়, পুরো জগন্নাথপুর উপজেলাবাসী শোকে মুহ্যমান।

Manual6 Ad Code

মৃতরা হলেন- উপজেলার চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া (২৫), একই গ্রামের শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক (২৩), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ (২৫), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২) ও পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬)।

সরেজমিন মৃত নাঈম মিয়ার বাড়িতে চিলাউড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তার মা আকি বেগম ছেলের মৃত্যুতে অঝোরে কান্না করছেন। তার বুকফাটা কান্নায় ব্যথিত স্বজনরাও।

Manual2 Ad Code

আকি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, আমার ছেলেকে দালাল মেরে ফেলেছে, তোমরা আমার নাঈমরে এনে দাও।

নাঈমের বাবা দুলন মিয়া জানান, জগন্নাথপুরের ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের সঙ্গে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে জানুয়ারি মাসে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পর গ্রিসের গেম (নির্ধারিত তারিখ) দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে দালাল। তার দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করার পরও গ্রিসে পাঠাতে টালবাহানা করে।

অবশেষে ২১ মার্চ গেম (নির্ধারিত তারিখ) দেওয়া হয়। কথা ছিল গেম (নির্ধারিত তারিখ) দেওয়ার আগে আমাদের জানানো হবে; কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। শনিবার জানতে পারি সাগরে আমার ছেলে মারা গেছে এবং তার লাশ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমি সরকারের কাছে এই দালালের বিচার দাবি করছি।

Manual3 Ad Code

একই গ্রামের ইজাজুল হক রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় পিনপতন নীরবতা। এলাকার লোকজন ভিড় করছেন বাড়িতে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা ইজাজুল হকের পরিবারকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

Manual1 Ad Code

ইজাজুল হকের বাবা সামছুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছাতক উপজেলার শক্তিগাঁও গ্রামের দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখান থেকে গ্রিসে পাঠানোর কথা। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠাতে কালক্ষেপণ করতে থাকে ওই দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ভয়েস বার্তায় জানায়, দালাল আমাদের খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছে না। বড় কষ্টে আছি। দোয়া করিও। এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। আমরা দালালের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। এখন শুনি আমার ছেলে মারা গেছে।

প্রতিবেশী ফজলু মিয়া বলেন, দালাল ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে প্ররোচিত করে অনেক পরিবারের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। তাদের কারণে অকালে ঝড়ছে তরতাজা প্রাণ। এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

চিলাউড়া-হলদিপুর ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, শনিবার রাতে খবর পেলাম আমার ইউনিয়নের একই গ্রামের দুই যুবক সাগরে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা গেছেন। তাদের মৃত্যুতে পুরো গ্রামের মানুষ শোকাহত। সংবাদ পরিবেশন

তিনি বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে দালাল চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের ফাঁদে দেশের শত শত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। অকালে প্রাণ হারাচ্ছে শতশত যুবক। দ্রুত সব দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৃতদের বাড়ি গিয়ে পরিবারের খোঁজ নিচ্ছেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, গ্রিস যাওয়ার পথে এ উপজেলার ৫ জন মারা গেছেন। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

উল্লেখ্য, ইউরোপের গ্রিস যাওয়ার জন্য দালাল চক্রের সঙ্গে প্রত্যেকে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা করে চুক্তি করে গত ৩-৪ মাস পূর্বে লিবিয়ায় যান। সেখান থেকে গত ২১ মার্চ রাবার বোটে গ্রিসের উদ্দেশে সাগরপথে যাত্রা করেন অভিবাসীরা। বোটে খাবার ও পানির সংকটের কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ১৮ জন মারা যান। তাদের মধ্যে জগন্নাথপুরের পাঁচজন। পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ওই যাত্রা থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা শনিবার গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন