Beanibazarer Alo

  সিলেট     বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিয়ানীবাজারে রাজাকারপুত্রের দখলে শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জিসি দেবের বাড়ি

admin

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৬:৫৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৬:৫৯ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
বিয়ানীবাজারে রাজাকারপুত্রের দখলে শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জিসি দেবের বাড়ি

Manual7 Ad Code

আবুল হাছান:
স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও দখলমুক্ত হয়নি বিশ্ব বরেণ্য মানবতাবাদী দার্শনিক শহীদ বুদ্ধিজীবী ড.গোবিন্দ চন্দ্র (জিসি) দেবের পৈতৃক বাড়িটি। স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০৮ (মরণোত্তর) পদকে তাঁকে ভূষিত করে জাতি আংশিক দায়মুক্ত হলেও তাঁর বাড়িটি দখলমুক্ত করা হয়নি এখনও।

ড. জিসি দেব’র পদক প্রাপ্তি বিয়ানীবাজারবাসীকে যতটা গর্বিত করেছে ততটা হতাশ করেছে তাঁর পৈতৃক বাড়িটি দখলমুক্ত না হওয়ায়। স্থানীয় সুশীল সমাজের মতে- অনতিবিলম্বে বাড়িটি দখলমুক্ত করে ড. জিসি দেব জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হোক।

প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস এলে নানা আলোচনায় বাড়িটি উদ্ধারের কথা উঠলেও পরবর্তীতে ঝিমিয়ে পড়ে সকল কার্যক্রম। ইতোমধ্যে ড. জিসি দেব’র স্মৃতি রক্ষা আন্দোলনের নাম করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নাম সবর্স্ব বিভিন্ন সংগঠনের। কাগজে কলমে এসব সংগঠনের নাম থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কিছুই দেখা যায় না।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিয়ানীবাজার উপজেলার ১১নং লাউতা ইউনিয়নাধীন লাউতা গ্রামে ড. জিসি দেব’র পৈতিক বাড়ির সিংহভাগ দখলদারদের দখলে। দখলদাররা সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছে দীর্ঘদিন থেকে।

Manual1 Ad Code

জানা যায়, স্বাধীনতার পরবর্তী সময় স্থানীয় বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা রইজ্জুদ আলী ওরফে রইয়া রাজাকার প্রথমে বাড়ির কিছু অংশ দখল করে পরবর্তীতে বাড়ির অন্যান্য অংশও ধীরে ধীরে বেদখল হয়ে যায়। বর্তমানে ‘রইয়া রাজাকারের’ পুত্র ছমিক উদ্দিন দখলকৃত অংশে পাকা ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। অন্য অংশে ফনওই মালাকার ও গৌরাঙ্গচন্দ্র ঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে বসত করছেন।

বাড়িটি দখলমুক্ত করে ড. জিসি দেব’র স্মৃতি রক্ষার্থে সেখানে জাদুঘর অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দাবী বিগত কয়েক বছর ধরে চলে আসলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আলোর মুখ দেখবে এমনই আশা বাড়ি উদ্ধার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সুশীল সমাজের।

Manual4 Ad Code

বাড়িটির ভূমির মোট পরিমাণ ২.৪৭ শতক। চলমান জরিপে ১. ৪৭ শতক স্থানীয় জিসি দেব স্মৃতি সংসদ এর নামে রেকর্ড করা হয়েছে এবং ভূমির ১ একর ভিপি খতিয়ান ভূক্ত রয়েছে। অভিভাবকহীন হিসাবে পড়ে থাকার কারণে এটি ভূমিদস্যু মহল কাগজে কলমে লিজ দেখিয়ে ঘর নির্মাণ করে চিরতরে দখলের পায়তারা করে চলেছেন ছমিক উদ্দিন। দখলকারী পরিবারের অভিভাবক একজন স্বাধীনতা বিরোধী হওয়ার পর কিভাবে এই অনুমতি পায় তা এলাকাবাসীকে হতবাক করে দিয়েছে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকহানাদার বাহিনীর আক্রমণে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন যিনি স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও সেই ড. জিসি দেব’র সম্পত্তি দখলমুক্ত না হওয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে নানা কৌতুহল। বাড়িটি উদ্ধার করতে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে আন্দোলন চলে আসলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।

কেবল তাই নয় ৭ কাঠা জমির উপর ঢাকায় ড. জিসি দেব এর আরেকটি বাড়ি রয়েছে যা বর্তমানে সম্পূর্ণ বেদখলে। ড. জিসি দেব বাড়িটি হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন থেকে লোন নিয়ে কিনেছিলেন। বাড়ির অর্ধেক অংশ পালিত পুত্র ও পালিত কন্যার নামে এবং অর্ধেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে উইল করে যান। বাড়িটি দখলমুক্ত করতে আদালতে মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।

স্বাধীনতা পদকে ভূষিত ড. জিসি দেব’র সম্পত্তি দখল প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বিয়ানীবাজার সাবেক অধ্যক্ষ দারকেশ চন্দ নাথ বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও ড. জিসি দেব’র বাড়িটি দখলমুক্ত না হওয়া মানে সমগ্র দেশ এবং জাতির ব্যর্থতা। স্বাধীনতা পদক সম্মাননা আরো অনেক আগে দেয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করে কবি ফজলুল হক বলেন, স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় অতএব এখনই দলখলমুক্ত করার উপযুক্ত সময়। কেবল পদক দেয়ার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র দায়মুক্ত হলে চলবেনা তাঁর সম্পূর্ণ সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে হবে।’

লাউতা ইউনিয়নে ড. জিসি দেব স্মৃতি সংসদের সভাপতি, লাউতা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ জলিল বলেন, ড. দেব আমাদের অহংকার, আমরা আশা করি অবিলম্বে তাঁর বাড়িটি দখলমুক্ত করতে কর্তৃপক্ষ যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

এ ব্যাপারে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ড. জিসি দেবের পৈতৃক ভিটা অবৈধ দখলে রয়েছে-বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। সরেজমিনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জিসি দেবের স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার্থে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। যদিও উপজেলা পর্যায়ে সরকারের এমন কোন পরিকল্পনা নেই। তবুও আমরা চেষ্টা করবো।

প্রসঙ্গত, পঞ্চখণ্ড তথা বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তান আধুনিক মানবতাবাদী দর্শনের পথিকৃৎ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব (ড. জিসি দেব) ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি বিয়ানীবাজার উপজেলার লাউতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

Manual5 Ad Code

গ্রামের বালক বিদ্যালয় দিয়ে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। তারপর মধ্য স্কুল যা পরবর্তী লাউতা উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপ নেয়। অতঃপর ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত ও অংকে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উর্ত্তার্ণ হন।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন শাস্ত্রে প্রথম স্থান অর্জন করে এম. এ ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতা রিপন কলেজে (বর্তমানে স্যার সুরেন্দনাথ কলেজ) দর্শন ও ন্যায়শাস্ত্রের শিক্ষক হিসেবে পেশা জীবন শুরু করেন।

১৯৪৪ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান দেন। এবং মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সাথে জগন্নাথ হলের প্রভোষ্ট ছিলেন। এছাড়াও তিনি দেশে বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন।

দর্শনের পথিকৃৎ ড. দেব এর মানবতাবাদী কর্মকাণ্ডে উৎফুল হয়ে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘দি গোবিন্দ সেবা ফাউন্ডেশন ওয়াল্ড ফর ব্রাদার হুড’। এবং ১৯৮০ খ্রি. ফাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের দেব সেন্টার ফর ফিলসফিক্যাল স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

Manual5 Ad Code

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ীর নিজ বাসভবনে নির্মমভাবে এই জ্ঞান প্রদীপকে হত্যা করে।

শেয়ার করুন