Beanibazarer Alo

  সিলেট     বুধবার, ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেল ওদের স্বপ্ন

admin

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০১:০৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০১:০৯ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
ভূমধ্যসাগরে ডুবে গেল ওদের স্বপ্ন

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের অভ্র ফাহিম। তার স্বপ্ন ছিল উন্নত দেশে যাওয়ার। বাবা ফয়েজুর রহমান ছেলের সেই স্বপ্ন পূরণে সম্মতি দেন। ভেবেছিলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে সংসারের অভাব দূর করবেন এবং কিছুটা সচ্ছলতা আসবে। কিন্তু সেই স্বপ্নই ডুবে গেছে ভূমধ্যসাগরে।

শনিবার (২৮ মার্চ) লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার পথে দিক হারিয়ে সাগরে ভাসতে ভাসতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশী অভ্র ফাহিমসহ ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১২ জনের বাড়িই সুনামগঞ্জে। প্রতি বছর নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি জেনেও উন্নত জীবনের আশায় নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। কিন্তু এসব ঘটনায় পাচারকারী, ট্রাভেল এজেন্ট ও দালাল চক্রের সদস্যরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নিহতরা হলেন, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস; দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম; জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।

সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারে এখন চলছে মাতম। এ ঘটনায় দালালদের বিচার চাইছেন অনেকে।

Manual6 Ad Code

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় একটি রাবারের নৌকায় সমুদ্রে ভাসছিলেন অভিবাসন প্রত্যাশীরা। ছয় দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসের উপকূলে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে নৌযানটি ডুবে যায়। এতে নৌকায় থাকা ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে ছিলেন। গত শনিবার বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানান। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি রয়েছেন।

অন্যদিকে ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্সের মার্চ মাসের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে শুধু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে রাবারের নৌকায় চড়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী। এদের বেশির ভাগই বাংলাদেশ, সোমালিয়া ও পাকিস্তানের নাগরিক।জাতীয় খবর

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি। এর মধ্যে স্থল ও সমুদ্রপথে গেছেন ৫৮ হাজার ২৯ জন এবং পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন ৩৯ হাজার ৮০৩ জন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত জীবন ও আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে ইউরোপমুখী হওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে না পারাও একটি বড় কারণ বলে তারা মনে করেন।

Manual1 Ad Code

ভুক্তভোগী পরিবার ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমেরিকা বা ইউরোপে নেওয়ার কথা বলে টারজান ভিসার প্রলোভন দেখায় মানবপাচার চক্র। দালালরা প্রথমে ফ্রি ভিসার মাধ্যমে দুবাই বা দোহাকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসন প্রত্যাশীদের লিবিয়ায় নিয়ে যায়। কেউ কেউ কাতার হয়ে দালালের মাধ্যমে তুরস্কে যায়। কখনো পাচারকারীরা কলকাতা, মুম্বাই, দুবাই, মিশর ও বেনগাজি হয়ে ত্রিপোলিতে নিয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণ সুদানের মরুভূমি পাড়ি দিয়েও লিবিয়ায় নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় গাদাগাদি করে তাদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের পথে পাঠানো হয়। এ সময় পাচারকারী চক্র পাশবিক নির্যাতন করে তার ভিডিও ধারণ করে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে। কারো স্বজন টাকা দিতে না পারলে তাদের হত্যা করে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জানুয়ারি ভারতে পাচারের শিকার ১৬ জন বাংলাদেশি কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ শেষে দেশে ফিরেছে। ফরিদপুরের দুই যুবককে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় এবং ৩১ জানুয়ারি তাদের লাশের ছবি পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। গত বছরের ২৮ অক্টোবর ট্যুরিস্ট ভিসায় রাশিয়ায় পাঠিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হলে দুই বাংলাদেশির একজন নিহত হন। শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, রোহিঙ্গাদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পাচার করছে দালাল চক্র। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে দেড় শতাধিক রোহিঙ্গাকে ট্রলারে তোলা হলে তাদের আটক করে নিরাপত্তা বাহিনী।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দীন জানান, সম্প্রতি সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার সময় নৌকাডুবির ঘটনায় কিছু বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, যা সিআইডির নজরে এসেছে। সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ সেলের একটি দল নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা কীভাবে এবং কার মাধ্যমে পাচারের শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এ ঘটনায় মামলা করার বিষয়েও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। তবে গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি।

Manual1 Ad Code

তিনি আরও বলেন, দেশি-বিদেশি একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে মানবপাচার করে আসছে। তারা ট্যুরিস্ট ভিসার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের সন্তান বা বেকার যুবকদের ইতালি, গ্রিস, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাচার করে। জনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় চুক্তি করা হয়। অনেক সময় পাচারের শিকার ব্যক্তিরা ঝুঁকি জেনেও নিজেরাই এই পথে যায়, ফলে তারা মামলা করতে চায় না। এতে সিআইডির পক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

Manual7 Ad Code

শেয়ার করুন