মহাসড়ক বেহাল, আকাশপথে ভাড়া নাগালের বাইরে; তাই সিলেটের যাত্রীরা ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে যাতায়াতে ভরসা করেন রেলপথে। কিন্তু একসময়ের নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম রেল এখন হয়ে ওঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। ত্রুটিপূর্ণ রেলপথ, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও দুর্বল ইঞ্জিনের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, কমেছে ট্রেনের গতিও। ফলে রেলপথে বেড়েছে ভোগান্তি।
বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগে সিলেট-আখাউড়া সেকশনেই বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অদ্যবধি এই সেকশনে অন্তত ২১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সিলেট থেকে আখাউড়ার দূরত্ব ১৭৯ কিলোমিটার। শত বছরের পুরনো এই রেলপথ এখন জরাজীর্ণ। রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এই সেকশনের প্রায় পুরো রেলপথই বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে জোড়াতালি দিয়েই চলছে রেল। দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কার না হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে লাইনের ফিসপ্লেট, নাট-বল্টু ও স্লিপার নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক স্থানে স্লিপারের নিচ থেকে সরে গেছে পাথর। সূত্র জানায়, সিলেট-আখাউড়া সেকশনে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় আড়াইশ’ রেলসেতু রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী এই সেকশনের ১৩টি সেতু ‘মহাঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘ডেড স্টপ’ হিসেবে চিহ্নিত। এসব সেতুর ওপর দিয়ে ঘন্টায় ৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করতে হচ্ছে। এছাড়া সেকশনটিতে প্রায় ১০০টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ সেতু রয়েছে। সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হয়।এছাড়া সিলেট-চট্টগ্রাম ও সিলেট-ঢাকা রুটের সবকটি ট্রেনের ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের পুরনো ইঞ্জিন দিয়ে চালানো হচ্ছে ট্রেন। ট্রেনের স্বাভাবিক গতি যেখানে ৭০-৮০ কিলোমিটার সেখানে দুর্বল ইঞ্জিন ও জরাজীর্ন লাইনের কারণে ঘন্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার গতিতে চালাতে হচ্ছে ট্রেন। সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা ভূপ্রকৃতি এবং জরাজীর্ণ লাইনের কারণে বেশ কিছু এলাকা অত্যন্ত দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, রশিদপুর থেকে মাইজগাঁও পর্যন্ত অংশটি এই রুটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে কুলাউড়ার বরমচাল, শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও, কমলগঞ্জের শমসেরনগর, ভানুগাছ, ফেঞ্চুগঞ্জের ইলাশপুর, মল্লিকপুরকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অদ্যবধি সিলেট-আখাউড়া সেকশনে ছোট-বড় অন্তত ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ডিরেইলমেন্ট বা বগি লাইনচ্যূতির ঘটনা ঘটেছে ৫টি এবং অপারেশনাল দুর্ঘটনা ঘটেছে ১২টি।
এদিকে, সর্বশেষ গত বুধবার রাতে হবিগঞ্জের মাধবপুরে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা তেলের ওয়াগনবাহী রেল লাইনচ্যূত হয়। ফলে প্রায় ১৮ ঘন্টা সিলেটের সাথে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল।
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আবদুল জব্বার জলিল বলেন, ‘সিলেট-আখাউড়া সেকশনের রেলপথ ও সেতুগুলো ব্রিটিশ আমলের। রেলপথ দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কারণে ট্রেনে ঝাঁকুনি বেশি হয়। যাতায়াতে সময় বেশি লাগছে। এছাড়া প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এই রেললাইনটি ‘ডাবল লাইন’ করার দাবি সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের। আশাকরছি সরকার সিলেটবাসীর এই দাবি পূরণে উদ্যোগী হবেন।
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম জানান, সিলেট-আখাউড়া সেকশনের রেলপথ জরাজীর্ন হয়ে পড়েছে। যে কারণে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া সেতুগুলোও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।