Beanibazarer Alo

  সিলেট     বৃহস্পতিবার, ২৩শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে টিকে থাকার লড়াই

admin

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে টিকে থাকার লড়াই

Manual5 Ad Code

নিউজ ডেস্ক:
সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ মানুষ হাওর এলাকায় বসবাস করেন। হাওরে যখন আফাল ওঠে (বড় ঢেউকে স্থানীয় ভাষায় আফাল বলে) তখন এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। এ জন্য প্রতিবছর এখানকার বাসিন্দারা ঘর উঁচু করেন। কিন্তু পাহাড়ি ঢল তার থেকেও বড়। তাই নিরুপায় হয়ে পুরো বর্ষা মৌসুমে আফাল আর ঢল থেকে পরিবার-বসতভিটা রক্ষায় স্থানীয়রা প্রাণপণ চেষ্টা করেন।

Manual8 Ad Code

কখনো কখনো হাওরে বড় বড় আফাল এসে বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় তাদের পরিবারের সদস্যদেরও। এমন অনেক মর্মান্তিক গল্প আছে হাওরজুড়ে।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের বাহাদুর গ্রামের খরচার হাওরে দেখা হয় হিমাংশু বর্মণের (৪২)। হাওরে তখন বিশাল আফাল উঠেছে। একই সময় ভারতের মেঘালয় থেকে ঢল নামায় হাওরে তীব্র স্রোত তৈরি হয়। এই আফাল, পাহাড়ি ঢল ও স্রোতের মধ্যেই হিমাংশু বসতভিটা বাঁচাতে কাজ করছিলেন। হিমাংশু বিশ্বাসের মতো ওই গ্রামে আরও ১১০টি পরিবার থাকে। তারাও যার যার কাজ করছিলেন, এ জন্য কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে পারছিলেন না। হিমাংশু ভেসে আসা কচুরিপানা ও খড়কুটো দিয়ে বসতঘরের পাশে স্তুপ করে স্রোত আর আফালের তীব্রতা কমানোর চেষ্টা করছিলেন। সঙ্গে ছিল বাঁশ দিয়ে স্রোত আটকানোর চেষ্টা।

ঠিক পাশেই খেলা করছিল তার দুই বছরে শিশুসন্তান। ৫০ থেকে ১০০ ফুট প্রস্থের গ্রামটিতে বর্ষাকালে হাঁটার জায়গা থাকে না। গ্রামটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০০ ফুট। মূলত এই চিত্র সুনামগঞ্জের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫৪টি হাওরপাড়ের। বর্ষাকালে হাওরে এভাবেই টিকে থাকতে হয়।

Manual1 Ad Code

হিমাংশু বর্মণ বলেন, ‘এভাবেই বেঁচে থাকতে হয়। আমার বাপ-দাদারাও এভাবে জীবনযাপন করে গেছেন। আমরাও এভাবেই আছি। আমাদের সন্তানদেরও এভাবেই বাঁচতে হবে।’

Manual7 Ad Code

তিনি আরও বলেন, ‘এবারের বোরো ফসলও হাওরে নষ্ট হয়ে গেছে। তার পরও কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানি বেড়ে গেছে। বসতঘরের ওপর আফাল আছড়ে পড়ছে। বাড়ির পাশের মাটি সব ভেঙে যাচ্ছে। তাই মেরামতের চেষ্টা করছি। খেয়ে না খেয়ে হলেও একটু আশ্রয় তো নিতে হবে। রাতে বাচ্চাদের ঘুমানোর জায়গা করে দিতে হবে। হাওরে আমাদের টিকে থাকতে হলে এই লড়াই করতে হবে। আমরা যদি হাতগুটিয়ে বসে থাকি তাহলে পানির স্রোত সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

Manual5 Ad Code

একই গ্রামের গৃহিণী অলোক বর্মণ (৩৬) বলেন, ‘ছোট টিনের ঘরে বাচ্চা থাকে। যখন হাওরে বড় বড় আফাল ওঠে, ঢল নামে তখন ভয় পাই। রাতের আঁধারে কখন না জানি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কখন বন্যায় সব ডুবে যায়, অনেক কষ্টে তিলে তিলে গড়া সংসার পানির নিচে তলিয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘ভয় পেয়েও কোনো লাভ নেই। আমাদের জীবন এমনই, এখানে ভয় পেলে চলবে না, ঝড়, স্রোত থেমে গেলে আমরা আবার নতুন করে শুরু করি। কারণ আমাদের সন্তানদের খাওয়াতে হবে, মানুষ বানাতে হবে। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো চিন্তা নেই। আমরা বাঁচলে আমাদের বাচ্চারাও বাঁচবে।

সিলেটের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ওই গ্রামের বাসিন্দা রিপন বর্মণ (২২)। তিনি বলেন, ‘ডর-ভয় আছে। তবে এভাবেই টিকে থাকতে হবে। এখানে আমরা কোনোমতে জীবন বাঁচাই। সত্যি কথা বলতে, হাওর এলাকায় কোনো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই। চাইলেই অনেক কিছু পাওয়া যায় না। বেশি সমস্যা হয় কেউ অসুস্থ হলে। তাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া যায় না। তার পরও কষ্ট করে কোনোমতে উপজেলায় নিয়ে গেলেও কোনো সেবা পাওয়া যায় না। উপজেলা হাসপাতালে ডাক্তার থাকেন না। তাই সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিতে হয়। তখন ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে পড়ালেখা করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। হাওরে ঢেউ উঠলে নৌকা নিয়ে স্কুলে যাওয়া যায় না। নিজের ঘরের চারপাশে পানি রেখে পড়াশোনাও করা যায় না। এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই করুণ। এই মৌসুমে নৌকা ছাড়া এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি যাওয়া যায় না। তবে এখন সময় এসেছে হাওর নিয়ে, হাওরের মানুষ নিয়ে একটু চিন্তা করার। কারণ আমরাও ভোট দেই, তারা আমাদেরও এমপি, মন্ত্রী।

সুনামগঞ্জের হাওর নেতা অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, ‘হাওর এলাকার মানুষ খুবই মানবেতর জীবনযাপন করেন। এখন ২০২৬ সাল। বিশ্বে যেখানে মানুষ চাঁদে আসা-যাওয়া করছে, সেখানে আমাদের হাওরপাড়ের মানুষ স্কুলে যেতে, ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানোর জন্য, এক মুঠো খাবারের জন্য সংগ্রাম করছেন। সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। এ জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে এ অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারের রেখে দেশে আলো আসবে না। দেশের উন্নতি, অগ্রগতির কথা চিন্তা করলে সবাইকে নিয়েই করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হাওর এলাকার মানুষের কথা মাথায় রেখে দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনা করতে হবে। জেলার একমাত্র ফসল, তাও প্রতিবছর নানা কারণে ডুবে যায়। বর্ষা, বন্যায়, পাহাড়ি ঢলে ঘরবাড়ি ভেঙে এখানকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে যান। কৃষকরা বাড়িঘর ফেলে বড় শহরে চলে যান। তাই সরকারকে হাওর এলাকার দিকে সুনজর দিতে হবে। তবেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন