Beanibazarer Alo

  সিলেট     বৃহস্পতিবার, ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২০শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রিপন-লুনা দম্পতির কবজায় ৩২ ট্রেন

admin

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
রিপন-লুনা দম্পতির কবজায় ৩২ ট্রেন

Manual8 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
এক যুগের বেশি সময় ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত ৩২টি ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সালাউদ্দিন রিপন ও তার স্ত্রী মিফতাহুল জান্নাত লুনা। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত ৩৭টি ট্রেনের মধ্যে ৩২টিই নিয়ন্ত্রণ করছেন এই দম্পতি। চার বছরের জন্য ট্রেন পরিচালনার ইজারা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের আশীর্বাদে বারবার নবায়ন করা হয়েছে চুক্তি। নতুন ইজারা না করে অনিয়মের মাধ্যমে এই নবায়নের ফলে রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন সংস্থাটি। সালাউদ্দিন রিপন বরিশাল ৫ সংসদীয় আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দরপত্রে অংশ নিয়ে ট্রেন পরিচালনার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। দেশের বাণিজ্যিক রেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কব্জায় নিয়েছেন এই দম্পতি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ট্রেন পরিচালনার জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়া সব প্রতিষ্ঠানই ছিল রিপনের। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে খুব নিম্ন দরে টেন্ডারে অংশ নিয়েও কাজ পেয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে কারচুপি বা

অনিয়মের বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয় আর বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

আয়কর সনদে দেওয়া তথ্যমতে, মেসার্স এসআর ট্রেডিং, এলআর ট্রেডিং ও এনএল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী সালাউদ্দিন রিপন। টিএম ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী হিসেবে রয়েছেন মিফতাহুল জান্নাত লুনা। এই চার কোম্পানির ঠিকানাই রাজধানীর ৭৮ মতিঝিলে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, ট্রেন ইজারার জন্য খোলা দরপত্রে অংশ নেওয়া মেসার্স শান্তা ট্রেডার্স, এমকে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস ও রুবায়েত ট্রেড ইন্টারন্যাশনালও রিপনের অফিসের ঠিকানা ৭৮ মতিঝিলে পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে জানান, নামে-বেনামে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিয়ে থাকেন।

Manual8 Ad Code

তথ্যমতে, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ৮ জোড়া ট্রেন বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করছে। এগুলো হচ্ছে বলাকা কমিউটার, মহুয়া কমিউটার, জামালপুর কমিউটার, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার, কর্ণফুলী কমিউটার, তিতাস কমিউটার ও সাগরিকা কমিউটার। এগুলো সবকটিরই ইজারা পেয়েছেন রিপন-লুনা দম্পতি।

Manual2 Ad Code

রেলওয়ের তথ্যমতে, ৯৯ নম্বর ঢাকা কমিউটার, ৫ নম্বর আপ ও ডাউন কমিউটার এবং ৫৫৪ নম্বর লোকাল ট্রেন ইজারা নিতে দরপত্রে অংশ নেয় ৫টি প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানই আওয়ামী লীগ সমর্থিত এই দম্পতির। এসব কোম্পানির ঠিকানা একই। ২৩-২৪ রকেট মেইল ও ২৭-২৮ চিলাহাটি এক্সপ্রেস ট্রেনের দরপত্রে অংশ নিয়েছিল তিনটি প্রতিষ্ঠান। যার সবই রিপন-লুনা দম্পতির মালিকানাধীন। ১৫ নম্বর মহানন্দা, ৫৮৫ লোকাল ও ১৬ নম্বর মহানন্দা এবং ২৫/২৬ নম্বর নকশিকাথা এক্সপ্রেসের দরপত্রে অংশ নিয়েছিল তিনটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলোও রিপন-লুনার। এ ছাড়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক ট্রেনের দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন এই দম্পতি। অভিযোগ রয়েছে, এই দম্পতির অধীনে কর্মরত বিভিন্ন কর্মচারীরাও খোলা দরপত্রে অংশ নিয়ে বাণিজ্যিক ট্রেন পরিচালনার কাজ নিয়েছেন।

Manual7 Ad Code

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি ট্রেনের মধ্যে ১৬টি ট্রেনের পরিচালনার কাজও পেয়েছেন রিপন ও তার স্ত্রী লুনা।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, মহানন্দা এক্সপ্রেস ট্রেনটি প্রতিদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও খুলনার মধ্যে যাতায়াত করে। ২০০৯ সালে এই ট্রেনটি ইজারা দেওয়া হয়েছিল রিপনের এলআর ট্রেডিংকে। তখন প্রতি ট্রিপে একটি কোচের ইজারা মূল্য ধরা হয়েছিল ৪০ হাজার ৭৬০ টাকা। সে সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে খুলনা পর্যন্ত একজন যাত্রীর ভাড়া ছিল ৬০ টাকা। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে এই ভাড়া ৯৫ টাকা নির্ধারণ করা। অথচ তখন ইজারা মূল্য কমিয়ে ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ২৯ টাকা। অথচ একটি কোচও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালে ট্রেন পরিচালনার কাজ আবার বাগিয়ে নেয় রিপনের আরেক প্রতিষ্ঠান এনএল ট্রেডিং।

তথ্যমতে, চারটি প্রতিষ্ঠান এই দরপত্রে অংশ নিয়েছিল। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এনএল ট্রেডিং, টিএম ট্রেডিং, মেসার্স শান্তা ট্রেডার্স ও এলআর ট্রেডিং। যার সবই রিপন ও তার স্ত্রী লুনার মালিকানাধীন। ফলে কারসাজি করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিয়ে খুব নিম্নদরে কাজ পেয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, রিপনের চাচা ছিলেন ঢাকা রেলওয়ের ঠিকাদার। ২০০৪ সালে চাচার মৃত্যুর পর চাচাতো বোনকে বিয়ে করেন রেলের জগতে প্রবেশ করেন রিপন। এর পর রেলপথ মন্ত্রণালয় আর বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে রেলের জগতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন রিপন।

Manual1 Ad Code

কারসাজির মাধ্যমে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্রে অংশ নিলেও তা মূল্যায়নের সময় বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্মকর্তারা আমলে নেননি। ফলে একই ব্যক্তিকে বিভিন্ন ট্রেনের পরিচালনার কাজ দিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে অধিক রাজস্বপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

অনিয়ম আর কারসাজি করে বিভিন্ন ট্রেন পরিচালনার কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রিপনের মোবাইলে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, নামে-বেনামে এসব কোম্পানিকে টেন্ডার দিতে সরকারের সাবেক দুই মন্ত্রীর পক্ষ থেকে চাপ ছিল। যার কারণে বাধ্য হয়েই কাজ দিতে হয়েছে প্রভাবশালী এ দম্পতিকে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী গতকাল বলেন, অনেক আগে থেকে এই দম্পতি বাণিজ্যিক ট্রেনগুলোর পরিচালনার কাজ পেয়েছেন। খোলা দরপত্রের মধ্যেই তারা এই কাজ পেয়েছেন। কিন্তু তাদের কাজ দিতে কোনো চাপ বা সরকারের প্রভাবশালী মহলের নির্দেশ ছিল কিনা তা এখন বলতে পারছি না। এসব খোলা দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ভূমিকা কী ছিল তা নিয়ে কোনো জবাব দেননি তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের এই মহাপরিচালক পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা থাকাকালে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে একাধিক ট্রেনের চুক্তি অবৈধভাবে নবায়ন করে এই দম্পতিকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন।

শেয়ার করুন