Beanibazarer Alo

  সিলেট     শনিবার, ৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুনিরা জানালার গ্রিল ভেঙে প্রবেশ করে, তবে তারা শনাক্ত হয়নি: টাস্কফোর্স

admin

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০১:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০১:৩০ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
খুনিরা জানালার গ্রিল ভেঙে প্রবেশ করে, তবে তারা শনাক্ত হয়নি: টাস্কফোর্স

Manual7 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের অন্যতম আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সর্বশেষ গঠিত উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স ১৫ মাসেও কোনো কুল-কিনারা পায়নি। এর আগে থানা, ডিবি ও র্যাব তদন্ত করেছেন। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন কিংবা খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সর্বশেষ পিবিআইয়ের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স গত শুক্রবার পর্যন্ত সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। স্বজনহারা দুইটি পরিবার প্রায় ১৪ বছর ধরে সাগর-রুনি হত্যা মামলা বিচারের আশায় দিন কাটাচ্ছেন। এখন তারা এই মামলার বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেক ক্লুলেস কিংবা চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত সময়ে রহস্য উদ্ঘাটন ও খুনিদের গ্রেপ্তার করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করেছেন। ব্যতিক্রম শুধু সাগর-রুনি হত্যা মামলা। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র লুকায়িত রয়েছে বলে তাদের আশঙ্কা।

Manual2 Ad Code

গত বছর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠিত টাস্কফোর্স কমিটিকে শেষ বারের মতো ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার আদেশ দেন। এর আগে বিভিন্ন তদন্ত কমিটি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১২৩ বার সময় বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পিবিআইকে প্রধান করে পুলিশ হেডকোয়ার্টার, সিআইডি ও র্যাবের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়। এই টাস্কফোর্স কমিটির প্রধান হলেন পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক। গঠিত এই কমিটি গত ১৫ মাস ধরে সন্দেহভাজন লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ, ঘটনাস্থলের নানা ধরনের আলামত এবং বাসার সবকিছু তদন্ত ও বিভিন্নভাবে যাচাই-বাচাই করে দেখেছেন। এ পর্যন্ত তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বলে গতকাল পর্যন্ত জানা যায়।

Manual3 Ad Code

টাস্কফোর্সের প্রধান পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে যাচ্ছেন। সাগর-রুনির বাসার পূর্ব দিক দিয়ে জানালার গ্রিল ভেঙে খুনিরা প্রবেশ করে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত। ঐ ভাঙা গ্রিল দিয়ে লোকজন প্রবেশ করতে পারে কিনা নানা ধরনের টেকনোলজি ব্যবহার করে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার রহস্য তিমিরে থেকে যাবে।

Manual8 Ad Code

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজা বাজার অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটে সাগর-রুনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঐ রাতে এই সাংবাদিক দম্পতির ৫ বছর বয়সের একমাত্র শিশুপুত্র মেঘ বাসায় ছিল। ঐ সময় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অবুঝ শিশু ঘটনা সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। বর্তমানে মেঘের বয়স ১৯ বছর। প্রথম এই চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলাটি শেরে বাংলানগর থানায় কয়েক মাস ছিল। এ থানার এক কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন। পরে মামলাটির তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে (ডিবি) ন্যস্ত করা হয়। ডিবিও তদন্ত বেশ কয়েক মাস তদন্ত করে কোনো হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে কোনো ক্লু পায়নি। পরে আদালতের নির্দেশে সাগর-রুনি হত্যা মামলাটির তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১১ বছর র্যাব তদন্ত করেছে। দীর্ঘ সময় তদন্তে র্যাব সন্দেহভাজন আট জনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যাকাণ্ডের কোনো তথ্য তাদের কাছ থেকে র্যাব পায়নি। পরে গ্রেপ্তারকৃত আট জন আসামি ও স্বজন মিলে ২১ জনের ডিএনএ নমুনা যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরীক্ষা করানো হয়। সেই ডিএনএ রিপোর্ট এবং অপরাধ চিত্রের (ক্রাইমসিন রিপোর্ট) পর্যালোচনায় দুই জনের ডিএনএর পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এই সব পরীক্ষার পরও সন্দেহভাজন কোনো খুনি শনাক্ত হয়নি। র্যাবের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হয়েও সাগর-রুনি হত্যা মামলায় জড়িতদের শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্বজনহারা পরিবারের সদস্যরা হতাশ। এমনকি সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলও হতাশ হয়েছেন।

মামলার বাদী নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান জানান, মামলার কোনো অগ্রগতি নাই। আদৌ হবে কিনা তাও সন্দেহ। গত শুক্রবার সরেজমিনে পুরাতন ঢাকার নবাবপুর রোডে সাংবাদিক সাগরের বাসায় ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি যান। একতলা একটি জরাজীর্ণ বাসায় সাগরের মা সালেহা মনির ও পরিবারের সদস্যরা থাকেন। বাসার গেটের দরজায় গিয়ে ইত্তেফাক থেকে আসছে বলে তিনি চোখের পানি ছেড়ে দেন।

Manual3 Ad Code

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সালেহা মনির কিছুক্ষণ চুপ থাকেন। পরে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার কাছে সন্দেহ হচ্ছে কোনোদিন খুনিরা গ্রেপ্তার হবে কিনা। ১৪ বছরের কাছাকাছি সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জন্মদাতা মা হিসেবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার কলিজার টুকরা সাগর হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে যাব বলে সালেহা মনির জানান। চার কন্যা ও একমাত্র পুত্রসন্তান সাগর। সাগরের পিতা মন্ত্রিপরিষদের পার্সোনাল অফিসার (পিও) মনির হোসেন। তিনি ২০০৪ সালে মারা যান। সত্ ও নিষ্ঠাবান অফিসার হিসেবে এরশাদ সরকারের আমলে নবাবপুর রোডে এক কাঠার চেয়ে কম জায়গাটি মনির হোসেনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। একতলা জরাজীর্ণ ভবনটিতে দীর্ঘ সময় ধরে তারা বসবাস করে আসছেন। বৃষ্টি হলে বাসার সামনের রোডে হাঁটু পানি জমে যায়। বাসার ভিতরেও পানি প্রবেশ করে। এই পরিবেশে বসবাস করছেন বৃদ্ধা সালেহা মনির। সাগরের পরিকল্পনা ছিল যে, রাজউক থেকে প্ল্যান পাশ করিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করা। মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সাগর বলেন, মা চিন্তা করোনা, ডয়চেভেলে থেকে অনেক টাকা পাব। সেই টাকা দিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করব। পুত্র সাগরের সেই আশা আর পূরণ হলো না। ঘাতকের হাতে জীবন হারাল আমার আদরের পুত্র সাগর এবং পুত্রবধূ রুনি। এই বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। জরাজীর্ণ ভবনটি মেরামত করার জন্য সালেহা মনির গত সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছিলেন। কেউ এগিয়ে আসেনি বলেও তিনি জানান।

শেয়ার করুন