Beanibazarer Alo

  সিলেট     শুক্রবার, ২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিমানের সাবেক এমডির বাসায় গৃহকর্মীকে নির্যাতন: লোমহর্ষক বর্ননা বিচারকের

admin

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০১:১৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০১:১৪ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
বিমানের সাবেক এমডির বাসায় গৃহকর্মীকে নির্যাতন: লোমহর্ষক বর্ননা বিচারকের

Manual8 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদ্য সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানসহ চারজনের রিমান্ড শুনানিতে শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রিমান্ড শুনানির এক পর্যায়ে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন সেই গৃহকর্মীর জবানবন্দির কিছু অংশ পড়ে শোনান।

Manual5 Ad Code

আদালত উল্লেখ করেন, ১১ বছরের শিশু মোহনাকে খুন্তি দিয়ে মারধর করা হতো ও তার চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হতো। এছাড়া তাকে দীর্ঘ সময় বাথরুমে পানির মধ্যে আটকে রাখা হতো। যার ফলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পায়ে পচন ধরে যায়। শীতকালেও তাকে কোনো শীতের পোশাক দেওয়া হয়নি। ভালো খাবার তো দূরের কথা, সে বাথরুমের পেস্ট খেয়েছে এবং তাকে টয়লেটের পানি পান করে বেঁচে থাকতে হয়েছে।

বিচারক বলেন, জবানবন্দিতে উঠে এসেছে তার শরীরের মধ্যে মুখ থেকে গলা পর্যন্ত লম্বা পোড়া দাগ, যা এখন সাদা হয়ে আসছে। কপালে লাঠি দিয়ে মারার দাগ। হাতে বাঁশের লাঠির ও পোড়া দাগ আছে। দাগটি এখনো দগদগে। এমনকি পায়ের উরুর অংশে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকার দাগ আছে। পিঠে বাঁশের লাঠি দিয়ে মারার অসংখ্য চিহ্ন আছে। চোখ দুটি ভেতরে ঢোকানো ও কালো দাগ। শরীরে জ্বর ও মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা আছে। মাথার চুল ধরে টানার কারণে মাথা ব্যথার কথা বলেছে শিশুটি।

এ পর্যন্ত বলার পর উপস্থিত আইনজীবীরা আদালতকে জবানবন্দি আর না পড়ার অনুরোধ করেন। তারা বলেন, এই নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা সহ্য করা যাচ্ছে না। এক পর্যায়ে আদালত সাফিকুর রহমানের স্ত্রী বীথিকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি শিশুটিকে নির্যাতনের কথা আংশিক স্বীকার করেন।

এর আগে, গত ৮ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল মিয়া আসামি সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী ও অপর দুই গৃহকর্মীর সাত দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। সেই আবেদনের ওপর শুনানির জন্য মঙ্গলবার তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। এদিন বিকেলে শুনানির সময় মাথায় হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে চার আসামিকে আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।

এসআই রুবেল মিয়া প্রথমে বক্তব্য দেন। মোহনাকে আইনি সহায়তা দেওয়া নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ডিএমসি) ফাহমিদা আক্তার রিংকিসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন। শতাধিক আইনজীবী আসামিদের রিমান্ডে পাঠানোর পক্ষে সমর্থন জানান।

Manual1 Ad Code

শুনানিতে ফাহমিদা আক্তার বলেন, ভুক্তভোগীর ওপর চার আসামি পাশবিক নির্যাতন করেছেন। সাফিকুর রহমান কি কারণে নির্যাতন করেছে তা জানার জন্য রিমান্ড প্রয়োজন। ১২ বছরের নিচে শিশুকে নির্যাতন করা অপরাধ। বিথী (সাফিকুরের স্ত্রী) তাকে বাসায় রেখে নির্যাতন করেছেন। প্রথমে তারা শিশুটিকে খাটে রাখতো। পরে নিচে, এরপর বারান্দায় পরে টয়লেটে রাখে। টয়লেটের পেস্ট, টিস্যু খেয়ে বেঁচে ছিল শিশুটি। শীতের মধ্যে শীতের কাপড়ও তাকে দেওয়া হয়নি।

Manual5 Ad Code

তিনি বলেন, একটা ঘরের মধ্যে শিশুটির সঙ্গে যে ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে। তারা কাজের লোক হলেও বাইরে এসে প্রকাশ করতে পারতো। কিন্তু তারা তা করেনি। খুন্তি গরম করে তাকে ছ্যাঁকা দিত। সরকারি উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বাসায় এমন শিশু নির্যাতন দেশ ও জাতির জন্য লজ্জাকর। তাকে লোমহর্ষক নির্যাতন করা হয়েছে। এ সময় তাদের সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করেন তিনি।

আসামিদের পক্ষে এ কে আজাদ রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। তিনি বলেন, সাফিকুর রহমান অফিস করতেন। সপ্তাহে মাত্র একটা দিন বাসায় থাকতেন। তিনি এ ঘটনার বিষয়ে অবগত না। তার রিমান্ড নামঞ্জুরের প্রার্থনা করেন তিনি। অপর আসামিদেরও রিমান্ড নামঞ্জুরের প্রার্থনা করেন এ আইনজীবী।

Manual7 Ad Code

পরে সাফিকুর রহমান ও গৃহকর্মী রুপালী খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিন এবং তার স্ত্রী বিথীর সাত দিন এবং আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

এর আগে, গত ২ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় শফিকুর রহমান ওরফে সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথীসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, উত্তরা ৯ নং সেক্টরের শফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর, গোলাম মোস্তফাকে জানায় ওই বাসায় বাচ্চা দেখাশোনার জন্য ছোট মেয়ে খুঁজচ্ছে। পরে তাদের সঙ্গে দেখা করেন মোস্তফা।

তারা জানায়, যাকে রাখবে বিবাহসহ যাবতীয় খরচ বহন করবে। তাতে সম্মত হয়ে গত বছরের জুন মাসে মোহনাকে ওই বাসায় কাজে দেন মোস্তফা। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় মোহনাকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন বাবা। তবে এরপর আর মোহনাকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেননি আসামিরা। গত ৩১ জানুয়ারি বিথী মোস্তফাকে ফোন করে জানান, মোহনা অসুস্থ। তাকে নিয়ে যেতে। পরে মোহনাকে আনতে যান গোলাম মোস্তফা। সন্ধ্যা ৭টার দিকে গোলাম মোস্তফার কাছে মোহনাকে বুঝিয়ে দেন সাথী। তখন মোস্তফা দেখতে পান, মোহনার দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্নস্থান গুরুতর জখম।

মোহনা ভালোভাবে কথাও বলতে পারে না। সাথীকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে সদুত্তর দিতে পারে না। পরে তিনি মোহনাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।

পরে জিজ্ঞাসাবাদে মোহনা জানায়, ২ নভেম্বর মোস্তফা তার সঙ্গে দেখা করে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে অকারণে শফিকুর রহমান এবং বিথীসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাকে মারধরসহ খুন্তি আগুনে গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দিয়ে গুরুতর জখম করে।

এ ঘটনায় হোটেল কর্মচারী বাবা গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

শেয়ার করুন