Beanibazarer Alo

  সিলেট     বুধবার, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটে ফের ধরা পড়ছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক, নেপথ্যে কারা

admin

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬ | ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ | ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
সিলেটে ফের ধরা পড়ছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক, নেপথ্যে কারা

Manual1 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেটে একের পর এক অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক। সাম্প্রতিক সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে মিলছে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম এবং বিপুল পরিমাণ গুলি-কার্তুজ। এসব উদ্ধারকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-কারা এসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক মজুত করছে? কী উদ্দেশ্যে এগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে? এর পেছনে কি সক্রিয় কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, নাকি নাশকতার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, একসময় পাখি শিকারের জন্য ব্যবহৃত এয়ারগান এখন সিলেটে নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করা অবৈধ এয়ারগান পরিবর্তন করে তৈরি করা হচ্ছে প্রাণঘাতী ‘একনলা বন্দুক’। অন্যদিকে, ডেটোনেটর ও বিস্ফোরক সাধারণত পাথর ও কয়লার খনিতে ব্লাস্টিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর বা কয়লার স্তর আলগা করে পরে সেগুলো উত্তোলন করা হয়। তবে সম্প্রতি সিলেটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযানে এসব বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও কার্তুজ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক বেড়েছে।

Manual8 Ad Code

জানা গেছে, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় সম্প্রতি র‌্যাব ও বিজিবির অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, গুলি, কার্তুজ এবং অবৈধ এয়ারগান উদ্ধার করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া এসব অস্ত্র সংরক্ষণ আইনত দণ্ডনীয় হলেও অনেকেই অবৈধভাবে এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন।

সংবাদমাধ্যমে র‌্যাবের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৯) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পরিচালিত পৃথক অভিযানে মোট ১০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধারকৃত এই অস্ত্রের সাথে ব্যাপকহারে বিস্ফোরক, পাওয়ার জেল, ডেটোনেটর রয়েছে। এর মধ্যে র‍্যাব-৯ উদ্ধার করেছে ৭টি এবং বিজিবি উদ্ধার করেছে ৩টি অস্ত্র।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানাধীন ভূনবীর ইউনিয়নের রাজপাড়া এলাকার একটি বাঁশবাগানে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। একপর্যায়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তায় মোড়ানো পরিত্যক্ত অবস্থায় পাঁচটি চায়না এয়ারগান উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া এয়ারগানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে র‌্যাব-৯-এর তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানায় র‌্যাব।

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিলেটের গোলাপগঞ্জে থানার নং ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের উত্তর কানিশাইল এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় আগ্নেয়স্ত্র ও উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, এই অভিযানে কাউকে না পাওয়া গেলেও ঝোঁপ তল্লাশির এক পর্যায়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১টি দেশীয় ওয়ান শুটারগান, ৬টি পাওয়ার জেল, ৮টি খালি নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর, ৫টি সেফটি ফিউজ এবং থানা থেকে লুটকৃত ২টি টিয়ারশেল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পরে এগুলো গোলাপগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব।

এর আগে গত শুক্রবার (৫ জুন) দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে র‌্যাব-৯ এর সিপিসি-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আভিযানিক দল অস্ত্র উদ্ধারের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এসময় তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানাধীন পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পুনিয়াউট রেলক্রসিং সংলগ্ন এলাকার পুকুরপাড়ের একটি ঝোপের ভেতর পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি দেশীয় পিস্তল উদ্ধার করে র‌্যাব। তবে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি বলে জানায় র‌্যাব।

এদিকে অস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাব সদস্যদের পাশাপাশি বিজিবিও বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করছে। বুধবার (২৪ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়নের (৫২ বিজিবি) অধীনস্থ বিওসিটিলা বিওপির একটি আভিযানিক দল বড়লেখা সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রবেশ করছে এমন খবর পায়। পরবর্তীতে তাৎক্ষণিকভাবে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সীমান্তবর্তী মিশন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান চলাকালে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা রাতের অন্ধকার ও ঘন জঙ্গলের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি বিদেশি পিস্তল, ২৩টি টিউবে সংরক্ষিত তিন কেজি ‘পাওয়ারজেল-৯০’ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক, ২৪টি ডেটোনেটর, ১৫ মিটার ডেটোনেটর তৈরির তার এবং দুটি কুকরি চাপাতি উদ্ধার করা হয়।
বিজিবি জানায়, উদ্ধার করা অস্ত্র, বিস্ফোরক ও অন্যান্য সরঞ্জাম তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

Manual7 Ad Code

সিলেটের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে সিলেটের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িতে লুণ্ঠিত অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়ায় এখনও সিলেটজুড়ে আতঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে। লুন্ঠিত এই সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। অস্ত্রধারী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।

Manual3 Ad Code

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২৪ সালের ৫ আগস্ট এসএমপির বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত ১০১টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হলেও বাকি ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। অন্যদিকে লুন্ঠিত ৫ হাজার ৭৪০ রাউন্ড গুলির মধ্যে ৫৪১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এমতাবস্থায় ১৮টি অস্ত্রের সাথে ৫ হাজার ১৯৯ রাউন্ড গুলির কোনো হদিস এখন পর্যন্ত নেই। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে-এসএমজি, চায়না রাইফেল, পিস্তল, শটগান এবং গ্যাস গান।

Manual4 Ad Code

অপরাধ বিশ্লেষকদের জানিয়েছেন, দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের প্রধান রুটগুলো মোটামুটি চিহ্নিত। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা জরুরি। এসব এলাকাকে নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় এনে ক্রাইম ম্যাপিং, জিআইএস ও জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধী চক্রকে শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা টহল এবং সিসিটিভি নজরদারি জোরদার করা গেলে অবৈধ অস্ত্র পাচার ও এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ধারাবাহিক ও জোরালো অভিযান না থাকায় অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে। দুর্বল নজরদারির কারণেই এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সারা দেশে একযোগে যৌথ অভিযান পরিচালনার এখনই উপযুক্ত সময়। অন্যথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৯) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া ) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘সিলেটে উদ্ধার করা এয়ারগানগুলো মূলত! পাখি শিকারের জন্য। এই এয়ারগানগুলো মানুষের জন্য কোনো ঝুঁকির কারণ নয়। তবে; অনেক সময় এই এয়ারগানগুলো দিয়ে একনলা আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করা যায়। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে উদ্ধার ও জব্দকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, এয়ারগান, শটগান ও সাউন্ড গ্রেনেড জিডিসহকালে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়। উদ্ধারকৃত এয়ারগানগুলো অবৈধ তাই এগুলো জব্দ করা হয়েছে। শুধুই এয়ারগান নয় সকল প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাবের নিয়মিত ধারাবাহিক বিভিন্ন অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ অস্ত্র, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতিমালা রয়েছে। আমরা সার্বক্ষনিক আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ০৫ আগস্টের পর থেকে অদ্যবধি র‌্যাব-৯, সিলেট বিভাগ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দায়িত্বপূর্ণ এলাকা থেকে সর্বমোট ৪৮টি দেশী ও বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, ১০৪ রাউন্ড গুলি, ০৬টি ম্যাগাজিন, ৩৫হাজার ৭৩০ গ্রাম বিস্ফোরক, ২২৪টি ডেটোনেটর, ০১টি সাউন্ড গ্রেনেড, ০৫টি পেট্রোল বোমা, ১১টি ককটেল এবং বিপুল পরিমাণ এয়ারগানের গুলিসহ ১৪৯টি এয়ারগান উদ্ধার করেছে যা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং সিলেট বিভাগীয় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও জানান র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন