Beanibazarer Alo

  সিলেট     শুক্রবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটের বাতাসে এখনো শাহজালাল আছেন, থাকবেন চেতনায়

admin

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৬:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৬:৩০ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
সিলেটের বাতাসে এখনো শাহজালাল আছেন, থাকবেন চেতনায়

Manual6 Ad Code

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন:
সিলেটের বাতাসে এখনো শাহজালাল আছেন, থাকবেন চেতনায়, একটি অঞ্চলের মানুষের গল্পে ও পরিচিতিতে। সিলেটেরই বহু মানুষ আছেন, যারা শাহজালাল (রহ.)-এর দরগায় কোনো দিনই যাননি। আমি মোটামুটি সেই দলেই ছিলাম। বিশ্বাসের অভাব থেকে নয়, প্রয়োজনই হয়নি।

Manual3 Ad Code

পরে সমাজজীবনের নানা দৌড়ঝাঁপে জড়িয়ে পড়ার পর দরগাহে যাওয়া যেন কাজেরই অংশ হয়ে উঠল। কখনো জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী, কখনো হুমায়ূন আহমেদ, কখনো মোস্তফা জামান আব্বাসী—এমন বহু আলোকিত মানুষকে নিয়ে শাহজালালের দরগাহে গিয়েছি। আজও সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে আতরের গন্ধ, পুরোনো পাথরের সিঁড়ি, মানুষের ভিড়, আর এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি।

Manual7 Ad Code

সিলেটকে বুঝতে হলে এই দরগাহকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। ইতিহাস বড় অদ্ভুত জিনিস। সে কখনো পুরো সত্য বলে না, আবার পুরো মিথ্যাও নয়। ইতিহাসের মাঝখানে একটা ধূসর অঞ্চল থাকে। সেখানে দলিলের পাশাপাশি লোককথাও বেঁচে থাকে। আর সেই ধূসর অঞ্চলেই বাস করেন শাহজালাল (রহ.), শাহপরান (রহ.) এবং তাঁদের সঙ্গে আসা তিনশো ষাট আউলিয়া।
তাঁদের নিয়ে যত গল্প সিলেট অঞ্চলের আনাচে কানাচে, তত আলোচনা।

Manual1 Ad Code

চতুর্দশ শতাব্দীর শুরু। ইয়েমেনের তরুণ সুফি শাহজালাল। জনশ্রুতি বলে, তাঁর পীর সৈয়দ আহমদ কবীর তাঁর হাতে এক মুঠো মাটি তুলে দিয়ে বলেছিলেন, “যাও, পূর্ব দিকে যাও। যে মাটির সঙ্গে এই মাটির গন্ধ মিলে যাবে, সেখানেই থামবে।”

সেই এক মুঠো মাটি নিয়ে শুরু হয় এক দীর্ঘ যাত্রা। না ছিল পাসপোর্ট, না ছিল বিমান, না ছিল কোনো মানচিত্র। ছিল শুধু বিশ্বাস, আর পথ। দিল্লি, আজমীর পেরিয়ে তিনি পৌঁছালেন বাংলায়। তাঁর সঙ্গে এলেন আরও অনেক সাধক। কেউ বলেন ৩৬০ জন, কেউ বলেন তারও বেশি।

এই সংখ্যাটিও ইতিহাসের চেয়ে প্রতীকের মতো। বাংলায় “তিনশো ষাট” মানে কেবল একটি সংখ্যা নয়; পূর্ণতা, চারদিক, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার এক কাব্যিক ভাষা। সেই থেকেই সিলেটের ইতিহাসে শুরু আরেকটি অধ্যায়। গৌড়গোবিন্দের সঙ্গে সংঘর্ষের গল্প আমরা সবাই শুনেছি। ইতিহাস সেখানে যতটা, লোককথা তার চেয়ে কম নয়। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও কেরামতি, কোথাও অলৌকিক ঘটনা। এসব গল্পের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু একটা বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—এই গল্পগুলো শত শত বছর ধরে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। লোককথার শক্তি এখানেই। দলিলের আয়ু সীমিত হতে পারে, মানুষের মুখে মুখে ঘোরা গল্পের আয়ু অনেক দীর্ঘ।
শাহপরান (রহ.)-কে নিয়ে ইতিহাসও খুব স্পষ্ট নয়। তিনি কি সত্যিই শাহজালালের ভাগনে ছিলেন? নাকি কেবলই একজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী?
আজও নিশ্চিত উত্তর নেই। কিন্তু খাদিমনগরের পাহাড়ে তাঁর মাজারে প্রতিদিন মানুষ যায়। কেউ ইতিহাস যাচাই করতে নয়; কেউ যায় মন হালকা করতে, কেউ নীরবে প্রার্থনা করতে, কেউ শুধু বসে থাকতে। এই প্রয়োজনটা ধর্মের আগে মানবিক।
মানুষ যুগে যুগে এমন একটা জায়গা খুঁজেছে, যেখানে কথা বলা যায়, বিচার নয়।
শাহজালালকে ঘিরে জালালি কবুতরের গল্প আছে। মাজারের পুকুরের গজার মাছের গল্প আছে। অলৌকিকতার গল্প আছে। বিজ্ঞান হয়তো এসবের ব্যাখ্যা খুঁজবে।
কিন্তু সমাজবিজ্ঞান অন্য প্রশ্ন করবে—কেন সাতশো বছর ধরে মানুষ এই গল্পগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে?
কারণ গল্প কেবল তথ্য নয়। গল্প মানুষকে একসঙ্গে রাখে।

চতুর্দশ শতাব্দীর বাংলায় জাতিভেদ ছিল কঠোর। সামাজিক বিভাজন ছিল গভীর। সেই সময় সুফি সাধকেরা যে সমতার কথা বলেছিলেন, দরিদ্র-ধনী, উচ্চ-নীচ ভেদ না করার যে শিক্ষা দিয়েছিলেন—তা মানুষের কাছে নতুন ছিল। মানুষ টানেই এসেছিল। ভয়ে নয়।
অবশ্য ইতিহাসের অন্য পিঠও আছে। গৌড়গোবিন্দের পরাজয়ের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে পরাজিতদের নীরব ইতিহাসও। বিজয়ীরা সাধারণত ইতিহাস লেখেন, পরাজিতরা স্মৃতি হয়ে থাকেন।

তাই সিলেটের ইতিহাস একরঙা নয়। এখানে মন্দিরও আছে, মসজিদও আছে। দেবদেবীর গল্পও আছে, আউলিয়ার কেরামতিও আছে। সব মিলিয়েই সিলেট।
আজকের পৃথিবী থেকে পেছনে তাকালে অনেক কিছুই অবিশ্বাস্য মনে হয়। ইয়েমেন থেকে একজন মানুষ হেঁটে বাংলায় এলেন—এটাও বিস্ময়।
আবার ভবিষ্যতের মানুষ যখন আমাদের দিকে তাকাবে, তারাও হয়তো অবাক হবে।
একটা ছোট্ট যন্ত্রে পুরো পৃথিবী বন্দি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের মতো লিখছে। একটা ফুটবল ম্যাচে কোটি মানুষ কাঁদছে। প্রতিটি যুগেরই নিজস্ব অলৌকিকতা আছে।
প্রতিটি যুগেরই নিজস্ব মিথ।
প্রতিটি যুগেরই নিজস্ব বিতর্ক।
কিন্তু অবাক হওয়ার ক্ষমতাটা একই রয়ে গেছে।
আজও শাহজালালের দরগার সিঁড়ি বেয়ে উঠলে চা-বাগানের গন্ধ আসে। আতরের গন্ধ মিশে যায় পুরোনো পাথরের শীতলতায়। ভেতরে মানুষের দোয়া, বাইরে শহরের কোলাহল।
দুটি পৃথিবী পাশাপাশি হাঁটে।
প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসেন। কেউ বিশ্বাস নিয়ে, কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউ ইতিহাসের খোঁজে, কেউ শুধু পর্যটক হিসেবে। কিন্তু খুব কম মানুষই একেবারে খালি হাতে ফেরেন।
কেউ একটা গল্প নিয়ে যান।
কেউ একটা প্রশ্ন।
কেউ একটা দীর্ঘশ্বাস।
আর কেউ হয়তো একটু শান্তি।
সাতশো বছর আগে ইয়েমেন থেকে আনা সেই এক মুঠো মাটির গল্প সত্য হোক কিংবা লোককথা—তার চেয়েও বড় সত্য হলো, সেই গল্পকে ঘিরে একটি শহর নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছে।
শহর কেবল ইট-পাথরে তৈরি হয় না।
শহর তৈরি হয় স্মৃতিতে। বিশ্বাসে। লোককথায়। মানুষের অবিরাম গল্প বলে যাওয়ার ক্ষমতায়।
সেই কারণেই শাহজালাল কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন। তিনি সিলেটের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ।
আর যতদিন মানুষ গল্প বলবে, ততদিন সিলেটের বাতাসে তাঁর নাম ভেসে বেড়াবে। এখানে কায়দা কানুন করে কিছুই করা যাবে না, অন্তত সামাজিক ইতিহাস এমন কথা বলে না।

লেখক: সম্পাদক, প্রথমআলো নর্থ আমেরিকা।

Manual5 Ad Code

শেয়ার করুন