Beanibazarer Alo

  সিলেট     সোমবার, ২৪শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৯ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খেলার আনন্দে অসহিষ্ণুতার ছাপ কেন?

admin

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০১:১৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০১:১৫ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
খেলার আনন্দে অসহিষ্ণুতার ছাপ কেন?

Manual4 Ad Code

সম্পাদকীয়:
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বমানবতার এক মহামিলন। চার বৎসর পর পর এই আয়োজন সমগ্র পৃথিবীকে যেন এক সুতোয় গাঁথিয়া ফেলে। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, ভূগোল কিংবা রাজনীতির বিভাজন ভুলিয়া কোটি মানুষ একই ভাবাবেগে শামিল হয় । বাংলাদেশে সেই উৎসবের রং অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় যেন আরো বর্ণিল। বিশেষত ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরিয়া ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকায় ছাইয়া যায় আমাদের গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দর। তবে আনন্দের এই রঙের মাঝেই যখন রক্তের লালচে দাগ স্পষ্ট হইয়া উঠে, তখন দুঃখজনকভাবে উৎসবের অর্থই হইয়া পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ । গতকাল কুমিল্লায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখিবার সময় তর্কবিতর্কের জেরে এক সমর্থকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা যেন এই বাস্তবতাকেই আবারও স্মরণ করাইয়া দিল । শুধু কুমিল্লার ঘটনা নহে, বগুড়ায় খেলা লইয়া সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটিয়াছে এবং তাহারও পূর্বে কুষ্টিয়ায় এক সমর্থক আত্মহনন করিয়াছেন বলিয়া পত্রিকান্তরে জানা যায় । এই ঘটনাগুলিকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না । কারণ, ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও বাংলাদেশে ফুটবল-সম্পর্কিত কমপক্ষে ২৩টি মৃত্যুর ঘটনা, সমর্থকদের সংঘর্ষে বহু আহত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ঘটিয়াছিল । বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন সমগ্র বিশ্ব আনন্দে উদ্বেল হইয়া উঠে, তখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৈরিতার খেসারত হিসাবে নিভিয়া যায় তাজা প্রাণ—ফুটবল কি আমাদের এই শিক্ষা দেয়?

Manual7 Ad Code

ফুটবল হইল মানুষের হৃদয় জয় করিবার খেলা; ইহা ঘৃণার নহে, ভালোবাসা ও ঐক্যের ভাষা । জয়-পরাজয়কে মর্যাদার সহিত গ্রহণ করা, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা এবং নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা—এই মূল্যবোধই ফুটবলের প্রাণ। খেলায় একটি দল জিতিবে, অন্যটি হারিবে; ইহাই খেলার স্বাভাবিক পরিণতি; কিন্তু সেই ফলাফলকে কেন্দ্র করিয়া যদি বিবদমান সমর্থকদের প্রাণ পর্যন্ত ঝরিয়া যায়, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে, সমস্যা ফুটবলে নহে বরং উহা আমাদের মস্তিষ্কে, মানসিকতায়।

Manual2 Ad Code

ফুটবলের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রহিয়াছে, যাহা মানবতার জয়গান গাহিয়াছে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের একটি প্রদর্শনী ম্যাচ দেখিবার জন্য উভয় পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হইয়াছিল—ইহা আজও ফুটবলের ঐক্য সৃষ্টিকারী শক্তির প্রতীকরূপে স্মরণ করা হয়। ঘটনাটির ঐতিহাসিক বিবরণ লইয়া বিতর্ক থাকিলেও ইহার প্রতীকী তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে, ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিভক্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করিবার ক্ষেত্রেও খেলাধুলা পালন করিয়াছিল এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা । অর্থাৎ, ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—ক্রীড়া মানুষকে বিভক্ত করে না । গভীরভাবে লক্ষ্যণীয়, যাহাদের লইয়া কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ, সেই খেলোয়াড়েরা কখনোই বিদ্বেষের শিক্ষা দেন না । খেলা শেষে তাহারা প্রতিপক্ষকে আলিঙ্গন করেন, অভিনন্দন জানান, পরাজিতের কাঁধে হাত রাখেন । অথচ হাজার হাজার মাইল দূরে বসিয়া আমরা তাহাদের নামেই পরস্পরের বিরুদ্ধে বৈরিতায় জড়াই—ইহা কি কোনো সভ্য সমর্থকের পরিচায়ক হইতে পারে?

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি মানুষের ভালোবাসা বিশ্বের বহু গণমাধ্যমেও আলোচিত হইয়াছে । এই আবেগ আমাদের প্রাণবন্ত সংস্কৃতির অংশ বটে; কিন্তু আবেগ যখন অন্ধ উন্মাদনায় পরিণত হয়, তখন আনন্দ উৎসবের পরিবর্তে শোকের কারণ হইয়া দাঁড়ায় । ফুটবলকে কেন্দ্র করিয়া যেই অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়, তাহা কেবল খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সমাজের সর্বস্তরেই তাহার প্রতিফলন দেখা যায়। আর যেই সমাজ খেলাকে কেন্দ্র করিয়া সহিংস হইয়া উঠিতে পারে, সেই সমাজে মতের ভিন্নতা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা সামাজিক মতপার্থক্যও সহজেই সংঘাতে রূপ লয় । এই প্রবণতাকে কেবল ক্রীড়াজনিত উচ্ছ্বাস বলিয়া উড়াইয়া দেওয়ার সুযোগ নাই । অতএব, সংঘাত-সংঘর্ষের পরিবর্তে আমরা কি প্রকৃত মূল্যবোধের চর্চা বাড়াইব না?

শেয়ার করুন