Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা : বন্ধ ছিল সবার ফোন, বিচ্ছিন্ন ছিল পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ

admin

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা : বন্ধ ছিল সবার ফোন, বিচ্ছিন্ন ছিল পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘শনিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ফোন দিছি। আমার দিদির ফোনেও ফোন ঢোকে না, দুঃখিত বলে। জামাইবাবুর ফোনেও ফোন ঢোকে না। ভাগনির ফোনেও ফোন ঢোকে না। আর প্রিয়ম যে ক্লাস ফাইভে পড়ে ওর একটা বাটন ফোন আছে, সেটাতেও ফোন ঢোকে না। পরে এসে দেখি তালাবদ্ধ, পুরো বাসা অন্ধকার। কারো কোনো সাড়াশব্দ নেই।’ কাঁদতে কাঁদতে একথাগুলো বলছিলেন পূজা চক্রবর্তী।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় গিয়ে চারটি মরদেহ পায় পুলিশ।

খোঁজখবর নেওয়ার জন্য শনিবার রাতে বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ফোন করেছিলেন পূজা চক্রবর্তী। বোনের ফোন বন্ধ পেয়ে একে একে বোনের স্বামী, তাদের মেয়ে এবং ছেলেকে ফোন করেন। সবারই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এরপর রংপুর নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডেরর কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়ায় বোনের বাসায় এসে দেখেন তালাবদ্ধ, পুরো বাসা অন্ধকার, ঘর বন্ধ, ভেতরে জিনিসপত্র এলোমেলো। পুলিশে খবর দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে দোতলা বাসার উপর ও নিচতলা থেকে একে একে চারজনের লাশ উদ্ধার হয়।

Manual4 Ad Code

পূজা চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, আমার স্বামী অফিস থেকে আসার পর আমি বললাম, দিদিদের ৪টা ফোনই বন্ধ কেন? চলো তো যাই ওদের বাসায়। আমরা আসলাম, কলিং বেলও বাজে না। দেখলাম, পুরো বাড়ি অন্ধকার। দিদি, দিদি, আগামী (প্রার্থী), প্রিয়ম করে চিল্লাতে চিল্লাতে প্রতিবেশী কিছু চলে আসলো।

তিনি বলেন, তখন এক প্রতিবেশী বলল, আজকে (শনিবার) দুপুরের দিকে কী জানি অর্ডার করছিল, পার্সেল আসছিল। তখন কলিং বেল চাপছে কেউ খোলে না, লোকটা ঘুরে গেছে। পরে পাশের একটা বাসায় গেলাম। তখন দুই বাড়ির মাঝের ছোট্ট একটা প্রাচীর টপকিয়ে উঠলাম। জোরে জোরে জানালার থাই গ্লাসে ধাক্কা দেওয়ার পর সেটা খুলে গেছে। মোবাইলের আলো দিয়ে দেখি, ওদের ওয়্যারড্রবের ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ যা যা ছিল সব ছড়ানো-ছিটানো। তখন আমি চিৎকার করলাম।

পূজা বলেন, আমার ভাগনের লাশ ছিল খাটের নিচে। আমার বড় বোনকে সিঁড়িতে ফেলে রাখছে। আমার বড় বোনের ওপর ভাগনিকে ফেলে রাখছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

ঘটনার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, উনি খুব ভালো মানুষ। অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করছেন। খুব শান্ত মানুষ। তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেলল। আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী! আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক।

পূজা চক্রবর্তীর ডাকাডাকি শুনে স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে এটা তো কেউ কল্পনাও করতে পারে না। এভাবে একটা পরিবারের চারজন খুন হবে- এটা ভাবা যায় না।

Manual5 Ad Code

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ি কাজ এখনও শেষ হয়নি। সেই বাড়ির দোতলায় সম্প্রতি পরিবার নিয়ে থাকা শুরু করেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়ির নীচতলাটা ফাঁকাই। তারা নতুন এসেছেন বলে এখনও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠেনি।

Manual7 Ad Code

স্থানীয়রা বলছেন, শনিবার রাতে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী এসে ডাকাডাকি করেন। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে বাসার প্রবেশ পথের দরজা বন্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে।

Manual2 Ad Code

গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কয়েকটি দল ঘটনাস্থলে রাতভর ছিল। তারা আলামত দেখে ও বিভিন্ন সূত্র ধরে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছিলেন বলে জানান।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলছেন, বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের কোনো এক সময় তাদের খুন করা হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের গলায় দড়ি ও গামছা প্যাঁচানো রয়েছে। শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করেছে। তাদের পুরো ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এটা ডাকাতি হতে পারে। আমরা এ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছি। তদন্তের পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

তিনি আরও জানান, দোতলা বাড়ির প্রধান গেট তালাবদ্ধ ছিল। তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দোতলার ঘরের খাটের নিচ থেকে প্রিয়ম, তিনতলায় ওঠার সিঁড়ির থেকে প্রীতিলতা ও প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করা হয়।

রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ঘটনাটি দুই থেকে তিন দিন আগের। প্রাথমিক আলামত দেখে এটি ডাকাতির ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। গামছা বা কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ছিল। পাশাপাশি ঘরের ভেতরের আসবাবপত্রের যেসব স্থানে স্বর্ণালংকার রাখা হতো, সেসব জায়গা ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন সিআইডির তদন্তুর টিম প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে। কিভাবে এই হত্যাকাণ্ড হলো তা দেখতে এরই মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) আবদুল মাবুদ জানান, প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের কাজ চলছে। নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ডিবি পুলিশ ও সিআইডিসহ পুলিশের অন্য ইউনিটগুলো তদন্ত শুরু করেছে।

এদিকে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা আজ দুপুরে মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘটনার পর রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুর মহানগর বিএনপির নেতারা।

শেয়ার করুন