Beanibazarer Alo

  সিলেট     মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শহিদ সেনা দিবসে প্রধানমন্ত্রী

প্রতিটি সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য

admin

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
প্রতিটি সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য

Manual8 Ad Code
  • প্রথম বারের মতো শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী
  • জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন
  • সীমান্ত বাহিনীকে আরো আধুনিক ও সুসংহত করা হবে
  • গত ১৭ বছর দুর্বিষহ সংগ্রাম, অপরিসীম ত্যাগ আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পাওয়ার নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করেছেন স্বজনরা

 

স্টাফ রিপোর্টার:
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ঘটনার দীর্ঘ ১৭ বছর পর শহিদদের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণে আজ আমার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছে। আমি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন সেনা পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতো আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। ২০০৯ সালের সেই বিভীষিকাময় ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪টি প্রাণ ঝরে গিয়েছিল। প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প, প্রিয়জন হারানোর বেদনাবিধুর অধ্যায়, একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য।’

Manual6 Ad Code

গতকাল বুধবার ‘জাতীয় সেনা দিবস, ২০২৬’ উপলক্ষে শহিদ সেনা অফিসারদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় ও ইফতার অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে দিবসটি উপলক্ষে গতকাল সকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রদ্ধা জানান। পরে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তারা শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করেন। এর আগে সকাল ১০টার দিকে বনানীর সামরিক কবরস্থানে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিছুক্ষণ পরই আসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী।

Manual8 Ad Code

শহিদ সেনা অফিসারদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাহে রমজানের এই পড়ন্ত বিকালে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের, ৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শাহাদতবরণকারী সব ছাত্র-জনতাকে। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শাহাদতবরণকারী ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন বীর শহিদকে। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত শহিদ পরিবারবর্গের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’

Manual3 Ad Code

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, জাতির ইতিহাসে এক রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর দিন। এই দিনটি এলে প্রকৃতি যেন আবার স্মৃতি ও শোকের ভারে নীরব হয়ে যায়, বাতাসে ভেসে আসে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের আর্তনাদ। আমাদের হূদয় গভীর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির এই নির্মম ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যার বেদনা সময় পেরিয়ে আজও বহমান। আমি দেশে প্রত্যাবর্তনের পর পরই বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, গত ১৭ বছরে আপনাদের দুর্বিষহ সংগ্রাম, অপরিসীম ত্যাগ আর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পাওয়ার নিদারুণ যন্ত্রণা। আমি বিশ্বাস করি, পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই সেনাবাহিনী ও আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বর্তমান সরকার কাজ করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শিকড় আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রোথিত। ১৯৭১ সালের যেদিন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন সেদিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে তদানীন্তন ইপিআরের সদস্যবৃন্দ বেতারকেন্দ্রে দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে চলেছে। পরবর্তীকালে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সুসংহত করতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু করেন। সেনাবাহিনী থেকে যোগ্য ও মেধাবী অফিসারদের প্রেষণে প্রেরণের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৭৮ সালে এই বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো সামরিক কায়দায় নতুন করে পুনর্গঠিত হওয়া। পূর্বের উইংসমূহকে পরিবর্তন করে ব্যাটালিয়নে রূপান্তর করা হয়। দুইটি নতুন ব্যাটালিয়ন সংযোজন করে বাহিনীর সংগঠনকে পরিবর্ধিত করা হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। দেশের প্রশ্নে আমরা সীমান্ত বাহিনীকে আরো আধুনিক ও সুসংহত করব। আমাদের সদস্যরা দেশপ্রেম ও পেশাগত উত্কর্ষে সীমান্তে দায়িত্ব পালন করবে।’

Manual6 Ad Code

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ও স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশ গঠনে সেনাবাহিনীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আমি মনে করি, পিলখানার এই মর্মান্তিক ঘটনা ছিল আমাদের সার্বভৌমত্বকে নস্যাতের একটি অপপ্রয়াস। পিলখানার ঘটনার পরিক্রমায় আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামোর দুর্বলতা ফুটে ওঠে। তাই বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামোকে আরো আধুনিক, সময়োপযোগী ও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমাদের সরকার কাজ করবে। একই সঙ্গে শহিদ পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে তাদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাহে রমজান আমাদের সংযম ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি— তিনি যেন শহিদদের আত্মাকে শান্তিতে রাখেন, তাদের পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দান করেন এবং আমাদের রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের পথে পরিচালিত করেন।’

এর আগে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহিদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকশ দল সামরিক রীতিতে সম্মান প্রদর্শন করে। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এরপর তারা শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শহিদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক ও শহিদ পরিবারের সদস্যরা।

শেয়ার করুন