Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ৩০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর আগে যে ফোনে ছিল মুন্নির শেষ কথাগুলো, সেটি কোথায়?

admin

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:৪৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:৪৯ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
মৃত্যুর আগে যে ফোনে ছিল মুন্নির শেষ কথাগুলো, সেটি কোথায়?

Manual5 Ad Code

নিউজ ডেক্স:
‘ওরা আমাকে যেকোনো সময় মেরে ফেলতে পারে’—বাবা-মায়ের কাছে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন মরিয়ম আক্তার মুন্নি। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের কথা ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে তাঁদের জানিয়েছিলেন তিনি। এরপর স্থানীয় এক ব্যক্তির ফোন পেয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বাথরুমের কাঠের বীমের সঙ্গে মেয়ের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান বাবা হাজী মকবুল আলী।

সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁকে বলেন, মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু মেয়ের মৃত্যুর আগে নির্যাতনের অভিযোগ, শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার দাবি এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—মুন্নির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি খুঁজে না পাওয়ায় সন্দেহ কাটছে না পরিবারের। তাঁদের প্রশ্ন, মৃত্যুর আগে যে ফোনে বাবা-মাকে ভিডিও ও খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন মুন্নি, সেই ফোনটি এখন কোথায়?

মুন্নির মৃত্যুর ঘটনা এখন বড়লেখায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। এ নিয়ে বিভিন্নজন নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখালেখি করছেন। এটি আত্মহত্যা, নাকি অন্য কিছু—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পরিবার। তবে পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Manual3 Ad Code

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে মুন্নির মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছে তাঁর পরিবার।

বিয়ের পর থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ
২০২৩ সালে বড়লেখা উপজেলার মুড়িরগুল গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী মামুনুর রশিদ লাভলুর সঙ্গে পারিবারিকভাবে মুন্নির বিয়ে হয়। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন তিনি। মুন্নি এসব কথা নিয়মিত বাবা-মা ও স্বজনদের জানাতেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। তাঁর এক বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি অনেক কিছু সহ্য করেই সংসার করছিলেন বলে পরিবারের ভাষ্য। নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি পরিবারের।

পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পরও চাপ
পরিবারের অভিযোগ, সম্প্রতি মুন্নির ননদ, ভাসুর, জা ও শাশুড়ি বাবার বাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। স্বামীর জন্য সৌদি আরবে গাড়ি কেনার কথা বলে এই টাকা চাওয়া হয়। পরে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিবার পাঁচ লাখ টাকা দেয়। কিন্তু এরপরও টাকার জন্য চাপ দেওয়া বন্ধ হয়নি। বরং ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য আরও টাকা এনে দিতে মুন্নিকে চাপ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ পরিবারের। এ অবস্থায় একপর্যায়ে বাবা-মাকে মুন্নি বলেন, তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে।

শেষবারও বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন নির্যাতনের কথা
পরিবারের ভাষ্য, গত ২১ আগস্ট শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে মুন্নির বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ। মুন্নি তখন ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে বাবা-মাকে বিষয়টি জানান। মেয়ের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে বাবা স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ করেন তিনি। পরে এক মুরব্বি ফোন করে জানান, বিষয়টি সমাধান হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই আসে আরেকটি ফোন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পরিচয়ে একজন মুন্নির বাবাকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখেন, তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বাথরুমের কাঠের বীমের সঙ্গে ঝুলছিল তাঁর মেয়ে মুন্নির লাশ। বাথরুমের দরজাও খোলা ছিল বলে পরিবারের দাবি।

‘আত্মহত্যা’ নিয়ে পরিবারের সন্দেহ
ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন বলে জানান। কিন্তু পরিবারের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়নি। কারণ, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও মুন্নি নির্যাতনের কথা তাঁদের জানিয়েছিলেন বলে দাবি পরিবারের। এরপর হঠাৎ তাঁর আত্মহত্যার খবর পাওয়ায় তাঁরা সন্দেহ করেন। পরিবারের আরও দাবি, লাশ নামানোর পর মুন্নির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এসব আঘাতের ছবি ও ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। তাঁদের দাবি, এসব আলামত গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা হলে মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসতে পারে।

যে ফোনে ছিল শেষ কথাগুলো, সেটি কোথায়?
মুন্নির মৃত্যুর পর তাঁর মোবাইল ফোনটি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। এই ফোনটিকেই এখন গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে দেখছে তারা। কারণ, মৃত্যুর আগে মুন্নি এই ফোন থেকেই বাবা-মাকে ভিডিও পাঠিয়েছিলেন এবং খুদে বার্তায় নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন বলে তাঁদের দাবি। ফোনটি উদ্ধার করা গেলে মৃত্যুর আগে মুন্নির সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল, কী ধরনের বার্তা আদান-প্রদান হয়েছিল এবং কোনো ভিডিও বা অন্য তথ্য সংরক্ষিত ছিল কি না—এসব জানা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছে পরিবার। তাই মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছে তারা।

Manual8 Ad Code

ময়নাতদন্ত নিয়ে পরিবারের অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ, মুন্নির লাশ থানায় নেওয়ার পর কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি ময়নাতদন্ত না করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে পরিবারের দাবির পর শেষ পর্যন্ত ময়নাতদন্ত করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যেন কোনো প্রভাবের কারণে প্রভাবিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার দাবি জানিয়েছে পরিবার। একই সঙ্গে সুরতহাল প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও, মোবাইল ফোন, ভিডিও, খুদে বার্তা ও কলের তথ্যসহ সব আলামত সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার দাবি জানানো হয়েছে।

Manual6 Ad Code

‘মামলা নেয়নি পুলিশ’
মুন্নির পরিবার অভিযোগ করেছে, ঘটনাটি নিয়ে হত্যা মামলা করতে চাইলেও থানা মামলা গ্রহণ করছে না। পাশাপাশি একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তাঁদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার। মুন্নির বাবা-মা বলেন, মেয়েকে হারিয়ে তাঁরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁদের একমাত্র চাওয়া, মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের হোক এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হোক।

পুলিশের বক্তব্য
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান শনিবার বিকেলে মুঠোফোনে বলেন, লাশ উদ্ধারের পর একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গৃহবধূর মৃত্যুর লক্ষণ দেখে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছি। প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Manual8 Ad Code

মুন্নির পরিবারের অভিযোগ, তিনি মৃত্যুর আগে নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর মোবাইল ফোনও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ময়নাতদন্তের পাশাপাশি এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হবে কি না, এখন সেটিই তাঁদের প্রধান প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন