Beanibazarer Alo

  সিলেট     মঙ্গলবার, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৌলভীবাজার রাজনগরে যে পরিবারের করুণ কাহিনী

admin

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৬:০৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৬:০৯ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
মৌলভীবাজার রাজনগরে যে পরিবারের করুণ কাহিনী

Manual5 Ad Code

রাজনগর সংবাদদাতা:
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার একটি পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতার করুণ ইতিহাস। একই বাড়ির দুটি পরিবারে বর্তমানে ১১ জন সদস্য দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। দৃষ্টিশক্তিহীনতার কারণে তাদের কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ নেই। চরম দারিদ্র্য, বসবাসের অনুপযুক্ত ভাঙাচোরা ঘর, নদীভাঙন এবং বন্যার দুর্ভোগ- সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আধাপাকা একটি জরাজীর্ণ ঘরেই বসবাস করছেন তারা। ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, নেই ন্যূনতম খাদ্যসংস্থান। অভাব-অনটন যেন এই পরিবারের নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মনু নদীর ভাঙন ও বন্যার দুর্ভোগ। নদীর বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকলেই চরম বিপাকে পড়তে হয় পরিবারটিকে। তাদের এতোসব কষ্ট মাঝে মনু নদী বার বার নিয়ে আসে সীমাহীন ভোগান্তি। বাঁধ ভেঙ্গে গেলেই তারা তারা পড়েন মহা দূর্ভোগে। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়েও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের বড়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম দক্ষিণ ইসলামপুরে বসবাস করেন সহোদর কামাল মুন্সি ও লাফুল মিয়ার পরিবার। তাদের বাবা ও দাদা দুজনই ছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। সেই পারিবারিক সূত্রেই জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হন কামাল মুন্সি ও লাফুল মিয়া। বংশপরম্পরায় প্রতিবন্ধিতার এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। কামাল মুন্সির পরিবারে তার ছেলে জগলু মিয়া, ফখরুল মিয়া ও মেয়ে সুফি বেগম জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। পরবর্তী প্রজন্মে ফাইজা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও শারমিন ও সোহান দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার পাশাপাশি মানসিক প্রতিবন্ধিতায়ও ভুগছে।

Manual3 Ad Code

অন্যদিকে, লাফুল মিয়ার পরিবারে ছেলে সারজক মিয়া, নাতি আকবর আলী এবং নাতনি আনিকা আক্তারও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ফলে একই পরিবারের দুটি শাখায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলেছে প্রতিবন্ধিতার এই নির্মম বাস্তবতা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বিভিন্ন সময় চিকিৎসার চেষ্টা করা হলেও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাভাবে বর্তমানে চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে গেছে। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় তারা কোনো কাজ করতে পারেন না, আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ কাজের সুযোগও দেন না। ফলে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করেই চলছে দুই পরিবারের জীবন।

সাম্প্রতিক নদীভাঙন ও বন্যা তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চারপাশে পানি থাকায় বাইরে যেতে পারছেন না, আবার অন্যরাও সহজে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে অনেক সময় একবেলা খেয়ে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে কথা হলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফি বেগম বলেন, ‘আমি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আগে মানুষের বাড়িতে ছোটখাটো কাজ করে কিছু সহযোগিতা পেতাম। কিন্তু বন্যার পর কোথাও যেতে পারছি না, আবার কেউও আমাদের কাছে আসতে পারছে না। একবেলা খেলে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।’

Manual3 Ad Code

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কামাল মুন্সি বলেন, ‘আমরা জন্ম থেকেই অন্ধ। চিকিৎসকরা বলেছেন আমাদের দৃষ্টি আর ফিরে আসবে না। টাকার অভাবে এখন চিকিৎসাও করাতে পারি না।’

এদিকে, সোমবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারটির জন্য নগদ আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

Manual7 Ad Code

রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান বলেন, ‘পরিবারটির ১১ জনের মধ্যে বর্তমানে ৮ জন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। বাকি তিনজন আবেদন করলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। সরকারি কোনো বিশেষ বরাদ্দ এলে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হবে।’

Manual5 Ad Code

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমরা খোঁজ নিয়েছি এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। আশা করছি, তাদের জন্য আরও ভালো কিছু করা সম্ভব হবে।’

শেয়ার করুন