Beanibazarer Alo

  সিলেট     বুধবার, ১২ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২৮শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লিবিয়ায় মাফিয়াদের কাছে জিম্মি সিলেট বিভাগের যে জেলার ১০ যুবক

admin

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১২:১৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১২:১৫ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
লিবিয়ায় মাফিয়াদের কাছে জিম্মি সিলেট বিভাগের যে জেলার ১০ যুবক

Manual7 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
স্বপ্ন ছিল ইতালি গিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর। সেই আশায় মানবপাচারকারীদের সঙ্গে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি করে বাড়ি ছেড়ে ছিলেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার একই গ্রামের ১১ যুবকসহ মোট ১৩ জন। কিন্তু স্বপ্নের ইতালি পৌঁছানো তো দূরের কথা, এখন লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন তাদের বেশিরভাগই।

১৩ জনের মধ্যে একজন বর্তমানে লিবিয়ায় পুলিশের হাতে আটক রয়েছেন। অন্য ১২ জন গত ১২ দিন ধরে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি আছেন। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে নির্মম নির্যাতন। হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে সেই নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে।

স্বজনদের অভিযোগ, জিম্মিকারীরা বাংলা ভাষাভাষী লোকদের দিয়ে ফোনে কথা বলাচ্ছে এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলছে। জিম্মি থাকা ১২ জনের মধ্যে ১০ জনের বাড়িই জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামে।

জিম্মি থাকা ওই যুবকেরা হলেন- নুরু মিয়ার ছেলে জীবন মিয়া (২৫), টুনু মিয়ার ছেলে আব্দুল কাইয়ুম (২৬), ফয়জুন নুরের ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪), শহীদ মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (২৭), রাশিদ মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৮), বাচ্ছু মিয়ার ছেলে এনামুল হক (২৬), জলিল মিয়ার ছেলে আতাউর রহমান (২৯), এখলাছ মিয়ার ছেলে আমিনুল ইসলাম (২৫), রাশিদ আলীর ছেলে সফিকুল ইসলাম (৩২) এবং আবুল কাশেমের ছেলে নিলয় মিয়া (২২)।

তাদের মধ্যে নুরু মিয়ার বড় ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০) লিবিয়ায় পুলিশের হাতে আটক রয়েছেন। এছাড়া জামালগঞ্জ উপজেলা সদরের তেলিয়াপাড়ার আবুল হামজা ও সাচনা গ্রামের আবুল কালামও জিম্মি আছেন। তাদের সঙ্গে অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার সময় জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া গ্রামের সোহেল মিয়াও রয়েছেন।

Manual2 Ad Code

স্বজনরা জানান, নাজিমনগর গ্রামের শহীদ মিয়ার (মন্টু) স্ত্রী দিলোয়ারা বেগম, তার ছেলে হুমায়ুন কবির এবং তার জামাতা একই উপজেলার কলকতখাঁ গ্রামের নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রতিজনকে ইতালি পাঠানোর জন্য ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় মৌখিক চুক্তি হয়েছিল। পরে সব টাকা পরিশোধ করা হলেও কেউই ইতালি পৌঁছাতে পারেননি।

Manual5 Ad Code

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জানুয়ারি ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন ওই যুবকেরা। প্রথমে তাদের আবুধাবি নেওয়া হয়। সেখান থেকে কুয়েত, পরে কুয়েত থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া থেকে ‘গেইম’ পদ্ধতিতে অর্থাৎ ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় সাগরপথে ইতালি পাঠানোর আগে একটি চক্র তাদের জিম্মি করে ফেলে।

Manual7 Ad Code

এরপর থেকেই জিম্মিকারীরা তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবারের মোবাইলে ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে এবং ২৬ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। বিকাশে টাকা পাঠাতে বলা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা।অনেক দরকষাকষি ও কাকুতি-মিনতির পর জিম্মিকারীরা জানিয়েছে, জনপ্রতি ১২ লাখ টাকা দিলে আগামীকাল রোববার রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে ।

জিম্মি সফিকুল ইসলামের বাবা রাশিদ আলী বলেন, দ্বিতীয় রোজার দিন ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো কথাবার্তা নাই, কোনো খবর জানি না। আমার ছোট মোবাইল, যাদের বড় মোবাইল আছে তাদের মোবাইলে মাফিয়ারা জানিয়েছে টাকা না দিলে ছাড়বে না। জায়গা-জমি বিক্রি করে ছেলেটারে বিদেশ পাঠাইছিলাম। আমি অসুস্থ মানুষ, হাতে কোনো টাকা-পয়সা নেই। এখন আল্লাহই ভরসা।

জীবন মিয়ার বাবা নুরু মিয়া বলেন, আমাদের গ্রামের দিলোয়ারা, তার ছেলে ও মেয়ের জামাইকে বিশ্বাস করে এতগুলো টাকা দিয়েছিলাম। টাকা গেলো, এখন ছেলেদের জীবনও খুব বিপদের মধ্যে আছে। আমাদের ধারণা, আমাদের কাছ থেকে টাকা নিলেও তারা অন্য দালালকে সঠিক টাকা দেয়নি। তাই তারা এই কাজ করেছে। এখন দিলোয়ারা, তার ছেলে ও মেয়ের জামাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

জিম্মি আতাউর রহমানের বড় ভাই হারুন মিয়া বলেন, আমরা বড় বিপদে পড়েছি। অনেক কষ্ট করে টাকা-পয়সা জোগাড় করে দালালকে দেওয়া হয়েছিল। ধারণা করছি আমাদের গ্রামের দালাল দ্বিতীয় দালালকে টাকা না দেওয়ায় সে নিজেই এই ঘটনা সাজিয়েছে এবং সবাইকে জিম্মি করে টাকা দাবি করছে। অনেক চেষ্টার পর ১২ লাখ টাকা করে দিলে সবাইকে মুক্ত করে দেবে বলে জানিয়েছে। গরু-বাছুর, বাড়ি-ঘরের জমি-জায়গা সব কিছু বিক্রি ও ঋণ করে সবাই চেষ্টা করছেন টাকা সংগ্রহ করতে।

নাজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য একরাম হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “এত টাকা দিয়ে এভাবে তাদের যাওয়া উচিত হয়নি। এখন সবাই বিপদে পড়েছে। গ্রামের ১০ জনের মধ্যে আমার চাচাতো ভাই দুইজন, ফুফাতো ভাই একজন, একজন ভাগ্নে এবং একজন চাচাও জিম্মি আছেন। সবার পরিবারের লোকজন এখন কান্নাকাটি করছেন।”

Manual7 Ad Code

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবিরের মা দিলোয়ারা বেগম প্রথমে বিদেশে পাঠানোর কথা স্বীকার করে বলেন,“সবাই বাইরোডে গেছে, তারা তো জায়গা মতো পৌঁছে গেছে। আজ রোববার ১২ লাখ টাকা (প্রতিজন) দিয়ে ছাড়ানোর দিন। সবাই নিজেরাই টাকা দেবে।

পরে তিনি আবার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা বিদেশে কোনো মানুষ পাঠাই না। গ্রামের মানুষের দেখাদেখি আমার মেয়ের জামাই কাইয়ুম, কালাম, মেয়ের দিকের নাতি এনামুল ও নিলয় জিম্মি আছে।

জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকুন নুর বলেন, কেউ আমার কাছে কোনো অভিযোগ করেননি বা জানাননি। আমি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। সরকারি নীতিমালা মেনে বৈধ প্রক্রিয়ায় কেউ প্রবাসে গিয়ে বিপদে পড়লে বা কোনো সমস্যা হলে সেটি দেখার সুযোগ থাকে। তারপরও বিষয়টি খোঁজ-খবর নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন