Beanibazarer Alo

  সিলেট     শুক্রবার, ২রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটে চাঙা বিএনপি, জোটের শরীক প্রার্থী নিয়ে টেনশনে জামায়াত

admin

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
সিলেটে চাঙা বিএনপি, জোটের শরীক প্রার্থী নিয়ে টেনশনে জামায়াত

Manual5 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

দলের প্রধান তারেক রহমানের সফরের পর ভোটের মাঠে চাঙা ভাব দেখা যাচ্ছে সিলেট বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের মধ্যে। অপরদিকে ১১ দলীয় জোটের শরীক দলের প্রার্থী নিয়ে টেনশন বাড়ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। সিলেট জেলার ৬টি আসনের মধ্যে ৩টিতে জামায়াত এবং বাকি ৩টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ দলীয় জোটের শরীক দলের প্রার্থীরা। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ১ জন ও খেলাফত মজলিসের দুইজন প্রার্থী রয়েছেন। এসব আসনে নিজস্ব প্রার্থী না থাকায় জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ রয়েছে। শুধু তাই নয়, উজ্জীবীত বিএনপির সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে পাল্লা দিয়ে জোটের প্রার্থীদের বিজয়ি করা নিয়েও টেনশনে আছে জামায়াত।

Manual3 Ad Code

সিলেট-০১ (সদর-সিটি কর্পোরেশন) আসনে বিএনপি এবারও আস্থা রেখেছে ২০১৮ সালের নির্বাচনে লক্ষাধিক ভোট পাওয়া দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের উপর। অপরদিকে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ও জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান। এর আগে সিলেট-০৬ আসন থেকে মাওলানা হাবিব নির্বাচন করলেও সিলেট-০১ আসনে তিনি নতুন। আসনটিতে ৯ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর চোখ। প্রচলিত রয়েছে, এ  আসনে বিজয়ী দল সরকার গঠন করে থাকে; যে কারণে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো এ আসন থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে থাকে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এই আসন থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপি প্রার্থী মুক্তাদির।

সিলেট-০২ (বিশ্বনাথ-ওসমানী নগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন তাহসিনা রুশদির লুনা। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু আইনের গ্যাড়াকলে ফেলে বাতিল করে দেওয়া হয় তার মনোনয়ন। পরে বিএনপি জোটের শরীক হিসেবে আসনটিতে মনোনয়ন পান গণ ফোরামের মোকাব্বির খান। নির্বাচনে অপরিচিত এই প্রার্থী বিজয়ী হন ইলিয়াস-আবেগ কাজে লাগিয়ে। চৌদ্দ বছর ধরে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ থাকলেও তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের মধ্যে এখনো তিনি রাজনীতির অনুপ্রেরণা হিসেবে বেঁচেন আছেন। ফলে ইলিয়াস না থেকেও এবারের নির্বাচনী মাঠে বড় ফ্যাক্টর তিনি। স্বামীর জনপ্রিয়তা নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন তাহসিনা রুশদির লুনা।

এ আসনে উদীয়মান সূর্য প্রতীকে গণফোরামের মুজিবুল হক, হাতপাখা নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন এবং লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী নির্বাচন করছেন। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিল জেলার নায়েবে আমির অধ্যাপক মোঃ আব্দুল হান্নানের নাম। ভোট যুদ্ধে তিনি নতুন হলেও নির্বাচনী মাঠে বেশ ঘাম ঝরাচ্ছিলেন। তিনি মাঠে নামার পর বিভিন্ন স্থানে তার ছাত্ররাও পক্ষে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত শরীকদের চাপে আসনটি ছেড়ে দিতে হয় জামায়াতের এই নেতাকে। এ আসনে দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হন খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী। তবে এখন পর্যন্ত তারপক্ষে জামায়াত নেতা-কর্মীদের জোড়ালোভাবে নামতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে মুহাম্মদ মুনতাসির আলী  জানান, দেওয়াল ঘড়ির পক্ষে সবাই কাজ করছেন। মানুষও পরিবর্তনের পক্ষে সাড়া দিচ্ছেন।

সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন হেভিওয়েট তিন নেতা। শেষ পর্যন্ত দল আস্থা রাখে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি মোঃ আবদুল মালিকের উপর। প্রতীক বরাদ্দের পর মান-অভিমান ভুলে মনোনয়নবঞ্চিতরাও মাঠে নেমেছেন মালিকের পক্ষে। আসনটিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন জেলা যুব বিভাগের সভাপতি ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ। নির্বাচনী মাঠও তিনি বেশ জমিয়ে তুলেছিলেন। ভোটারদের ধারণা ছিল আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আসনটি জাটের শরীক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে ভেঙ্গে পড়েছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

Manual1 Ad Code

এলাকাবাসী বলেন, আসনটিতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু রিক্সা প্রতীক নির্বাচন করছেন। ভোটের মাঠে তিনি একবারেই নবীন। এ ছাড়া কওমীঘরানার ভোট রাজুর পক্ষে গেলেও আসনটিতে ‘মনভাঙা’ জামায়াতের খুব বেশি তৎপড়তা নজরে পড়েনি। ফলে এই আসনে জোটের প্রার্থী বিজয়ি করা নিয়েও টেনশন রয়েছে জামায়াতের মধ্যে। এ ছাড়াও সিলেট-০৩ আসনে জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান আতিক (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা রেদোওয়ানুল হক চৌধুরী (হাতপাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (ফুটবল) ও মইনুল বাকর (কম্পিউটার) নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

সিলেট-০৪ (জৈন্তাপুর-গোয়াইনঘাট-কোম্পানিগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি’র প্রার্থী হয়েছেন ভোটের মাঠে ‘ম্যাজিকম্যান’ হিসেবে পরিচিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। শহর থেকে প্রান্তিক এলাকায় গিয়ে জমিয়ে তুলেছেন নির্বাচনী মাঠ। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচনী নির্বাচন করছেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল প্রতীকে মুজিবুর রহমান ডালিম ও হাতপাখা নিয়ে নির্বাচন করছেন ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা সাঈদ আহমদ। আসনটিতে ভোটের লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন আরিফুল হক চৌধুরী।

Manual6 Ad Code

সিলেট-০৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) : দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী আসনটি নিয়ে অবশ্য বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই টেনশনে আছে। আলোচিত এই আসনে না বিএনপি, না জামায়াত- কেউ নিজ দলের প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। বিএনপি সমমনা জোটের প্রার্থী হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। অপরদিকে জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিস নেতা মুফতি মাওলানা আবুল হাসানকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত। তিনি দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন।

নিজ দলের প্রার্থী না থাকায় আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিএনপি’র মনোনয়ন না পেয়ে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিলেট জেলা শাখার সহসভাপতি (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশিদ ওরফে চাকসু মামুন। তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলের একটি অংশ এই বহিস্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে।

‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ মামুনুর রশীদের পক্ষে কাজ করায় দলটির ৯ নেতাকে গত শনিবার বহিষ্কার করে কেন্দ্র থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই আসনে মুসলিম লীগ থেকে মাওলানা বিলাল উদ্দিন হারিকেন প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের জোট প্রার্থী এবং বিদ্রোহী মামুনের ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ভোটাররা।

সিলেট-০৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমেদ চৌধুরী। এ আসনে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদের অ্যাডভোকেট জাহিদুর রহমান (ট্রাক), জাতীয় পার্টির আব্দুন নূর (লাঙ্গল) এবং মাওলানা মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম হেলিকপ্টার প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট বিএনপি’র বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা জেলার বিভিন্ন আসনে মনোনয়ন চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। এ নিয়ে মনোনয়নবঞ্চিত নেতার সমর্থক-কর্মীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ছিল। গত ২২ জানুয়ারি হযরত শাহজালাল (র.)’র পূণ্যভূমি, পর্যটন নগরী সিলেট সফর দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এই সফরে দলের মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচিত করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে যান তিনি। দলীয় প্রধানের এই সফরের পর থেকে সমর্থক কর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব দেখা যাচ্ছে। এখন আশায় আছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরাও।

Manual2 Ad Code

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেট সফরে আসার কথা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ওইদিন তাঁর নগরীর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভা করার কথা রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এই ‘সফর’ শরীক দলের প্রার্থীদের বিজয়ি করার ‘টনিক’ হিসেবে কাজ করেছে কি-না তার প্রমাণ মিলবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে।

শেয়ার করুন