স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশে বিগত চারটি নির্বাচনে ফল প্রকাশের পরই প্রথম যে বিশ্বনেতা বিজয়ী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মনমোহন সিং বা নরেন্দ্র মোদি, যিনিই দিল্লির ক্ষমতায় থাকুন– এ ‘নিয়মে’ কখনো ব্যতিক্রম হয়নি।সবশেষ ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালেও ঠিক সেই রেওয়াজেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল, যদিও বাংলাদেশে ভাবী প্রধানমন্ত্রীর নাম এবারে বদলে গেছে। এবং একটানা চারটি নির্বাচনে জেতার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এই ভোটে লড়াইয়ের সুযোগই পায়নি।
এই প্রেক্ষাপটেই শুক্রবার ভারতে সকাল ৯টা বাজার ঠিক পর পরই প্রধানমন্ত্রী মোদি এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে ‘সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি-র নির্ণায়ক জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য’ তারেক রহমানকে ‘উষ্ণ অভিনন্দন’ জানালেন।
তিনি আরও লিখলেন, এই জয় দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের মানুষ আপনার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছে।
আধঘন্টা খানেক পর তিনি একই জিনিস পোস্ট করলেন বাংলা ভাষাতেও, যাতে বাংলাদেশেও আরো বেশি মানুষের কাছে সে বার্তা পৌঁছে যেতে পারে। সেখানেই শেষ নয়, তিনি এরপর সরাসরি ফোন করেন তারেক রহমানকে।
যে তারেক রহমানের প্রতি ভারত অতীতে রীতিমতো শীতল মনোভাব দেখিয়েছে এবং তার সৌজন্যমূলক পদক্ষেপেও পাল্টা সাড়া দেয়নি, সেই একই রাজনীতিবিদের প্রতি এ আচরণকে রীতিমতো ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউ-টার্ন’ বলেই বর্ণনা করা যায়।
ভারতে পর্যবেক্ষকরা সবাই এক বাক্যে মেনে নিচ্ছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী বিএনপি সরকারই ভারতের জন্য এই মুহুর্তে সেরা বাজি, সেই উপলব্ধি থেকেই ভারতের এই পদক্ষেপ।
সেই সঙ্গে তারা এটাও বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেই এই ঘনিষ্ঠতা দানা বাঁধছে– এটাও আন্দাজ করা মোটেই কঠিন নয় বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন।
অতীতে বিএনপি সরকারগুলোর আমলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যতই ওঠাপড়া থাকুক, ভারত যে আপাতত সেসব পুরনো বিষয় মনে না রেখে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে আগ্রহী – এখন প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তায় সে কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশে নতুন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত যে বিভিন্ন ইস্যু ধরে ধরে আলাদা অবস্থান নিতে চায়, দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গতকালই (বৃহস্পতিবার) সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
ভারতের শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে যেমন বলা হচ্ছে, ঢাকায় যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সে দেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার বন্ধ না হলে সেই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুতেই সহজ হতে পারে না।
তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসানে একটি নতুন, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আগমনকে ভারত যে স্বাগত জানাচ্ছে ও তাদের প্রতি ইতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মোদিকে তারেকের প্রীতি উপহার এবং অত:পর
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যখন প্রথমবার নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের ক্ষমতায় এলো, বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।
কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক যেহেতু ছিল ঐতিহাসিক, সেই কংগ্রেসের এক দশকব্যাপী শাসনের অবসানের পর বিজেপি যখন ভারতের ক্ষমতায় আসে, তখন বিজেপির সঙ্গে বাংলাদেশের বিএনপির একটা স্বাভাবিক সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে বলে সে সময় তারেক রহমান ধারণা করেছিলেন। তারেক রহমানের ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র তখন তা এমন ধারণার কথা জানিয়েছিল।
বিজেপির নতুন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাতেই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে তখন তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি প্রীতি উপহারও পাঠানো হয়েছিল। দিল্লিতে সেটি পৌঁছে দিয়েছিলেন বিজেপির বৈদেশিক বিভাগের তখনকার নেতা, বিজয় জলি।
পাঠানো হয়েছিল আরও নানা ধরনের ‘ফিলার’ … কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, ভারত কিন্তু তখন তার পাল্টা সৌজন্য দেখায়নি। কিংবা দেখাতে পারেনি।
দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা অনেকে ধারণা করেন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না করতে সরকারকে সে সময় পরামর্শ দিয়েছিল।
ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী আবার বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বিএনপি-র সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপনের ব্যপারে খুব স্পর্শকাতর ছিলেন। তার সেনসিটিভিটি-ও একটা খুব বড় কারণ যে এই যোগাযোগটা সেভাবে হয়ে ওঠেনি।
বিএনপির সর্বোচ্চ নেত্রী খালেদা জিয়া ততদিনে শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ, দলের রাশ ক্রমশ চলে যাচ্ছে তারেক রহমানের হাতেই।