Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ১৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১লা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারেক রহমানের প্রতি উষ্ণতা দেখাতে ভারতের এক যুগ লাগলো কেন?

admin

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০২ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০২ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
তারেক রহমানের প্রতি উষ্ণতা দেখাতে ভারতের এক যুগ লাগলো কেন?

Manual5 Ad Code

তারেক রহমানের প্রতি উষ্ণতা দেখাতে ভারতের এক যুগ লাগলো কেন?
স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশে বিগত চারটি নির্বাচনে ফল প্রকাশের পরই প্রথম যে বিশ্বনেতা বিজয়ী দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মনমোহন সিং বা নরেন্দ্র মোদি, যিনিই দিল্লির ক্ষমতায় থাকুন– এ ‘নিয়মে’ কখনো ব্যতিক্রম হয়নি।

Manual4 Ad Code

সবশেষ ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালেও ঠিক সেই রেওয়াজেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল, যদিও বাংলাদেশে ভাবী প্রধানমন্ত্রীর নাম এবারে বদলে গেছে। এবং একটানা চারটি নির্বাচনে জেতার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এই ভোটে লড়াইয়ের সুযোগই পায়নি।

এই প্রেক্ষাপটেই শুক্রবার ভারতে সকাল ৯টা বাজার ঠিক পর পরই প্রধানমন্ত্রী মোদি এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে ‘সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি-র নির্ণায়ক জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য’ তারেক রহমানকে ‘উষ্ণ অভিনন্দন’ জানালেন।

তিনি আরও লিখলেন, এই জয় দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের মানুষ আপনার নেতৃত্বে আস্থা রেখেছে।

আধঘন্টা খানেক পর তিনি একই জিনিস পোস্ট করলেন বাংলা ভাষাতেও, যাতে বাংলাদেশেও আরো বেশি মানুষের কাছে সে বার্তা পৌঁছে যেতে পারে। সেখানেই শেষ নয়, তিনি এরপর সরাসরি ফোন করেন তারেক রহমানকে।

যে তারেক রহমানের প্রতি ভারত অতীতে রীতিমতো শীতল মনোভাব দেখিয়েছে এবং তার সৌজন্যমূলক পদক্ষেপেও পাল্টা সাড়া দেয়নি, সেই একই রাজনীতিবিদের প্রতি এ আচরণকে রীতিমতো ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউ-টার্ন’ বলেই বর্ণনা করা যায়।

ভারতে পর্যবেক্ষকরা সবাই এক বাক্যে মেনে নিচ্ছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী বিএনপি সরকারই ভারতের জন্য এই মুহুর্তে সেরা বাজি, সেই উপলব্ধি থেকেই ভারতের এই পদক্ষেপ।

Manual4 Ad Code

সেই সঙ্গে তারা এটাও বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেই এই ঘনিষ্ঠতা দানা বাঁধছে– এটাও আন্দাজ করা মোটেই কঠিন নয় বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন।

অতীতে বিএনপি সরকারগুলোর আমলে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে যতই ওঠাপড়া থাকুক, ভারত যে আপাতত সেসব পুরনো বিষয় মনে না রেখে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে আগ্রহী – এখন প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তায় সে কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

তবে বাংলাদেশে নতুন সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত যে বিভিন্ন ইস্যু ধরে ধরে আলাদা অবস্থান নিতে চায়, দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গতকালই (বৃহস্পতিবার) সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন।

Manual3 Ad Code

ভারতের শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে যেমন বলা হচ্ছে, ঢাকায় যে দলের সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সে দেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন-অত্যাচার বন্ধ না হলে সেই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুতেই সহজ হতে পারে না।

তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অবসানে একটি নতুন, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আগমনকে ভারত যে স্বাগত জানাচ্ছে ও তাদের প্রতি ইতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যখন প্রথমবার নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের ক্ষমতায় এলো, বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক যেহেতু ছিল ঐতিহাসিক, সেই কংগ্রেসের এক দশকব্যাপী শাসনের অবসানের পর বিজেপি যখন ভারতের ক্ষমতায় আসে, তখন বিজেপির সঙ্গে বাংলাদেশের বিএনপির একটা স্বাভাবিক সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে বলে সে সময় তারেক রহমান ধারণা করেছিলেন। তারেক রহমানের ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র তখন তা এমন ধারণার কথা জানিয়েছিল।

বিজেপির নতুন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাতেই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে তখন তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি প্রীতি উপহারও পাঠানো হয়েছিল। দিল্লিতে সেটি পৌঁছে দিয়েছিলেন বিজেপির বৈদেশিক বিভাগের তখনকার নেতা, বিজয় জলি।

পাঠানো হয়েছিল আরও নানা ধরনের ‘ফিলার’ … কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, ভারত কিন্তু তখন তার পাল্টা সৌজন্য দেখায়নি। কিংবা দেখাতে পারেনি।

Manual8 Ad Code

দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা অনেকে ধারণা করেন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি না করতে সরকারকে সে সময় পরামর্শ দিয়েছিল।

ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী আবার বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বিএনপি-র সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ স্থাপনের ব্যপারে খুব স্পর্শকাতর ছিলেন। তার সেনসিটিভিটি-ও একটা খুব বড় কারণ যে এই যোগাযোগটা সেভাবে হয়ে ওঠেনি।

বিএনপির সর্বোচ্চ নেত্রী খালেদা জিয়া ততদিনে শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ, দলের রাশ ক্রমশ চলে যাচ্ছে তারেক রহমানের হাতেই।

তবে প্রকাশ্যে না হলেও বিএনপি-র নানা স্তরের নেতাদের সঙ্গে ‘ট্র্যাক টু’ স্তরে বা পর্দার আড়ালে বিভিন্ন থিংকট্যাংক বা অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মারফত একটা যোগাযোগ ভারত বরাবর রাখতে চেষ্টা করে গেছে।

পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বিবিসিকে বলছিলেন, সে সময় আমি নিজেই এধরনের একাধিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। দিল্লিতে তো বটেই, এমন কী ব্যাংককেও।

হাসিনার পতনের পরই তারেকের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর বদল

২০২৪-র ৫ অগাস্ট বাংলাদেশে ক্ষমতার নাটকীয় পালাবদলের পর সার্বিকভাবে বিএনপি-র প্রতি এবং অবশ্যই তারেক রহমানের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গীতে একটা আমূল পরিবর্তন আসে।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি-ই যে ভারতের অবধারিত পছন্দ (‘অটোমেটিক চয়েস’), সেই উপলব্ধিই দিল্লির মনোভাবে এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ।

২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের তখনকার সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন রাজনীতি ছাড়ার ‘মুচলেকা’ লিখিয়ে নিয়ে তারেক রহমানকে লন্ডন যেতে বাধ্য করে, তখন ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী।

পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বিবিসিকে বলেন, সে সময়ের কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। এবং ২০০১ থেকে ২০০৬, বিএনপি আমলের সেই তারেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের যে পাহাড় ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন ১৭ বছরেরও বেশি যুক্তরাজ্যে কাটানোর পর তিনি কতটা পাল্টে গেছেন, তার মানসিকতায় কতটা পরিবর্তন এসেছে এটা বলা খুব মুশকিল।

কিন্তু এটা ধারণা করতেই পারি, ভারত যেভাবে এখন তার প্রতি ‘ওপেন আউটরিচ’ করছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি তাকে চিঠি লিখছেন বা শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাতে অবশ্যই ভারত তার কাছ থেকে কিছু নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, বলেন পিনাকরঞ্জন।

এখন এসব প্রতিশ্রুতিগুলো ঠিক কী হতে পারে, সেটা আন্দাজ করা কঠিন হলেও বিএনপি-ও আপাতত তাদের পুরনো ‘ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি’কে আঁকড়ে থাকবে না বলে দিল্লিতে অনেক পর্যবেক্ষকই ধারণা করছেন।

বিএনপি তাদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলেই বর্ণনা করে থাকে – তবে তারেক রহমান তার সাম্প্রতিক ভাষণগুলোতে ভারতকে কখনোই সরাসরি কড়া ভাষায় আক্রমণ করেননি, সেটাকেও দিল্লি ইতিবাচক বলেই মনে করছে।

‘ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানাতে এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আস্থা রেখেছে, এ কথা উচ্চারণ করতে নরেন্দ্র মোদী যে এতটুকুও সময় নেননি – তার পেছনে বড় কারণ এগুলোই।

তারেক রহমান দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারেন?তারেক রহমান দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারেন?
দিল্লির থিংকট্যাংক মনোহর পারিক্কর আইডিএসএ-র সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়ক যোগ করছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি নিয়েও পরবর্তী বিএনপি সরকার খুব বেশি জোরাজুরি করবে না বলেই তার বিশ্বাস। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এটাকে খুব বড় ইস্যু করার চেষ্টা করেছিল।

তারেক রহমানের সরকার বা বিরোধীরা এখনও হয়তো মুখে সেই দাবি জানাবেন– কিন্তু তার জন্য দিল্লির সঙ্গে অন্য কোনো আলোচনা থমকে যাবে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, বলছিলেন ড: পট্টনায়ক।

হিন্দুদের সুরক্ষা আর নিরাপত্তার প্রশ্নে কী অবস্থান?

গত দেড় বছরে বাংলাদেশে যে ইস্যুটি নিয়ে ভারত সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদে সরব ছিল, সেটি হল সে দেশে হিন্দু-সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। এ ইস্যুতে ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার আর দিল্লিতে মোদি সরকার বহুবার বিতর্কেও জড়িয়েছে– বাংলাদেশ এসব অভিযোগকে অতিরঞ্জন আর মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিলেও দিল্লি কিন্তু তাদের অভিযোগে অনড় থেকেছে।

এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে সেই অবস্থার কতটা পরিবর্তন ঘটে, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দেখার বিষয় হবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশে কারা ক্ষমতায় এলো তাতে সত্যিই কিছু আসে যায় না– কারণ সে দেশে হিন্দুদের অবস্থার উন্নতি না ঘটলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশা না করাই ভাল।

বিবিসিকে তিনি বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশে যে দলের সরকারই থাকুক, হিন্দুদের ওপর অত্যাচার কখনোই বন্ধ হয় না। সে আওয়ামী লীগই বলি, অথবা বিএনপি-র সরকার। খুন-ধর্ষণ-লুঠপাট চলতেই থাকে। আর এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো আমরা দেখেছি একজন হিন্দু যুবকের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর পনেরো-ষোলো বছরের কিশোররা মোবাইলে সেই ভিডিও রেকর্ড করে যাচ্ছে!

নতুন সরকার বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি একটু অন্তত ‘মানবিক মুখ’ দেখাবে, এই প্রত্যাশা জানালেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রধান মুখপাত্র অবশ্য মনে করেন না বাস্তবে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন হবে।

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে উদ্ধৃত করে তিনি যোগ করেন, এই রাজা আসে ওই রাজা যায় … জামা কাপড়ের রং বদলায় … দিন বদলায় না!

বিএনপির বিজয়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে নতুন শুরুর সম্ভাবনা দেখছে ভারতবিএনপির বিজয়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে নতুন শুরুর সম্ভাবনা দেখছে ভারত
“বাংলাদেশেও হিন্দুদের জন্য সত্যিই দিন বদলাবে, আমরা ঠিক এমনটা আশা করার মতো অবস্থাতেই নেই!” বলেন দেবজিৎ সরকার।

পশ্চিমবঙ্গে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক আবার মনে করেন, ওই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন যেহেতু আসন্ন – তাই সেই ভোটপর্ব না-মেটা পর্যন্ত বিজেপি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ইস্যুকে জিইয়ে রাখতে চাইবে।

তবে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখা বাংলাদেশের নতুন শাসকদের নিয়ে যতই উদাসীনতা দেখাক, দিল্লিতে তাদের সরকার কিন্তু রীতিমতো উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই সে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিচ্ছে।

শেয়ার করুন