Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শারফিন টিলার ধ্বংসযজ্ঞ থামছে না

admin

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৯:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৯:৩৮ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
শারফিন টিলার ধ্বংসযজ্ঞ থামছে না

Manual4 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

Manual2 Ad Code

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের শারফিন (শাহ আরেফিন) টিলায় এক সময় যাতায়াতের রাস্তা ছিল। শারফিনের (রহ.) ওরসে গাড়ি নিয়ে ভক্তরা টিলা পর্যন্ত যেতে পারতেন। দুই বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে সেখানকার চিত্র। কবরস্থান ও মসজিদ ছাড়া এখন আর সেখানে কোনো টিলা নেই। বারবার অভিযান ও আটকের পরও এই অপতৎপরতা ঠেকানো যায়নি। পুরো টিলা ধ্বংসের পরও পাথর উত্তোলন থামছে না। এতে জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাথর তুলতে গিয়ে মাটিচাপা পড়ে অনেক শ্রমিক মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দেড় বছরে আভিযানিক দলের ওপর অন্তত ৯ বার হামলা হয়েছে। একাধিকবার আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। সর্বশেষ গত ২০ মার্চ হামলা চালিয়ে একাধিক মামলার আসামি কালা মিয়াকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক এমপি শারফিন টিলা রক্ষায় পুলিশ ক্যাম্পের জন্য আধা সরকারিপত্র (ডিও) দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শিগগিরই সেখানে ক্যাম্প বসবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সিলেটের বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা মনে করেন, পরিবেশ রক্ষায় গণসচেতনতার পাশাপাশি স্থায়ী কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

শারফিন টিলা ও পাথর কোয়ারি 
কোম্পানীগঞ্জের চিকাডহর মৌজায় টিলার ভূমির পরিমাণ ছিল ১৩৭ একর। ৩০ বছর আগে টিলার একাংশে ৬০ একর জায়গাকে শারফিন টিলা পাথর কোয়ারি হিসেবে গেজেটভুক্ত করে সরকার। পরে মাজারের জন্য প্রায় ৮ একর জায়গা ওয়াকফ এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে শারফিনসহ কয়েকটি কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে সরকার। এর পরও  থেমে থাকেনি উত্তোলন। শারফিন টিলা ধ্বংসের অভিযোগে ২০০৯ সালের ১১ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে ১৩৭ একরের এ টিলাকে ‘মরা কঙ্কাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত থেমে থেমে ধ্বংসযজ্ঞ চলে শারফিন টিলা ও সেখানকার পাথর কোয়ারিতে। ফলে কোয়ারি ও টিলা পরিণত হয় বিরানভূমিতে। মাঝখানে কিছুদিন বন্ধ  থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই শারফিন টিলায় আবার শুরু হয় শাবলের তাণ্ডব। দেড় বছর আগে শারফিনের আস্তানার অংশ ও আশপাশ এলাকা অক্ষত ও গাছপালা দেখা গেলেও এখন সেখানে পুকুর সমান গর্ত। অভিযোগ রয়েছে, এ ক’দিনে শারফিন টিলা থেকে ৩০০ কোটি টাকার পাথর লুট করা হয়েছে।

Manual8 Ad Code

ঘুরেফিরে পুরোনো চক্র
এক দশক থেকে টিলার ভূমি মালিকনা দাবি করে পাথর তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। প্রশাসন একের পর এক অভিযান চালিয়েও বন্ধ করতে পারছে না এই অপতৎপরতা। বিএনপির উপেজেলা সভাপতি সাহাব উদ্দিনসহ একাধিক নেতার মদদে নতুন করে শুরু হয় পাথর উত্তোলন। এক পর্যায়ে পদ হারান সাহাব উদ্দিন। কখনও রাতে আবার কখনও ভোরে চলে উত্তোলন। সমানতালে চলে পাথরবাহী ট্রাক ও ট্রাক্টর থেকে চাঁদাবাজি। কখনও পুলিশ, কখনও রাজনৈতিক নেতাদের নামে তোলা হয় চাঁদা। এই অপতৎপরতায় যাদের নাম সামনে এসেছে তাদের মধ্যে অন্যতম স্থানীয় জালিয়ারপাড়ের বাসিন্দা মনির মিয়া, ইসমাইল মিয়া, ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি ফয়জুর রহমান ও তার ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা হুশিয়ার আলী, বিএনপিকর্মী সাবুল আহমেদ, ইব্রাহিম মিয়া,  কালা মিয়া, তার ভাই বশর মিয়া, ভাতিজা রমজান ও জিলু, চিকাডহর গ্রামের শাহীন মিয়া, আব্দুর রশিদ, আদই মিয়া, আইয়ুব আলী, আব্দুল কুদ্দুছ, বাহাদুরপুরের ওমর গাজী, আব্দুর রহিম।

প্রত্যাহার ১৩ পুলিশ সদস্য 
পাথর সম্পদ রক্ষা যাদের দায়িত্ব, সেই খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) কখনও এসব লুটপাটের খবর রাখে না। সাদাপাথরকাণ্ডে প্রথমবার বিএমডির পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয়েছিল। গত ৩০ বছরে কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ পাথর লুট হলেও সরাসরি কোনো মামলা করেনি সংস্থাটি।

Manual5 Ad Code

যদিও উপজেলা প্রশাসন তাদের পক্ষে কাজ করে আসছে। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা পুলিশের কাজ না হলেও তাদের নানাভাবে যুক্ত হতে দেখা যায়। গত দেড় বছরে অর্ধশত অভিযান হয় শারফিন টিলায়। ভোলাগঞ্জ থেকে শারফিন সড়কের স্থানে স্থানে অতীতে পাথর বোঝাই ট্রাক্টর থেকে চাঁদা আদায় করে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ গত ১১ ফ্রেব্রুয়ারি শারফিন টিলা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ কোম্পানীগঞ্জ থানার ১৩ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।

Manual3 Ad Code

শারফিন টিলা থেকে পাথর উত্তোলনের ব্যাপারে পশ্চিম ইসলাম ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াদ আলী বলেন, অতীতে আমরা চেষ্টা করেছি। কেউ কারও কথা শোনে না। প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করেও আটকাতে পারছে না। শারফিনের মাজার, টিলা, কবরস্থানসহ সব জায়গা ধ্বংস করা হয়েছে।

নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে যুবলীগ নেতা ফয়জুর জানান, অতীতে শ্রমিকরা যে যার মতো পাথর তুলেছে। এখন কারা করছে জানি না।
থানার ওসি শফিকুল ইসলাম খান জানান,  তিন মাস হয়েছে তিনি এই থানায় যোগ দিয়েছেন। তাঁর সময়ে তিনটি পুলিশ এসল্ট মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৮-৯টি মামলা হয় শারফিন টিলা ঘিরে। তিনি জানান, পাথর রক্ষা তাদের কাজ নয়, তারপরও পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে। একমাত্র গণসচেতনতা ছাড়া পাথর রক্ষা সম্ভব নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, সবার আগে মানুষের স্বভাবের বদল প্রয়োজন। বারবার অভিযান চালিয়েও পাথর উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না।

শেয়ার করুন