Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২২শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিলেটের ট্রিপল মার্ডার : এজাহারে যে অভিযোগ সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির মেয়ের

admin

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
সিলেটের ট্রিপল মার্ডার : এজাহারে যে অভিযোগ সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির মেয়ের

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকায় ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম হত্যার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা। হত্যাকান্ডের তিনদিন পর শুক্রবার রাতে সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে কতোয়ালি থানায় এ মামলা দায়ের করেন।

এজহারে জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরেই তারা বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে, হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের হাতে আটক বাবুল মিয়ার নাম এজহারে উল্লেখ করা হয়নি।

এজহারে সেলিনা সুলতানা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তার বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন।

২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন।

এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন তার বাবা। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম সেলিনার বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজহারে সেলিনা অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

Manual6 Ad Code

সেলিনার অভিযোগ, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তার বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় তার বাবা আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
মামলায় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে ভাড়াটে লোক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। যদিও ঘটনার পর থেকে পুলিশ দাবি করছে, গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে প্রেমের জেরে বাবুল আক্তার নামে এক যুবক এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। বাবুল আক্তারকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর সেলিনা সুলতানা সাংবাদিকদের বলেন, আমি আর আমার ভাই আসছি। আমি বিশ্বাস করি না তিনজনকে একা একটা ছেলে হত্যা করেছে। এর পেছনে বড় কোন হাত আছে। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, পরবর্তীতে যেন আর কোনো মা-বাবার এ রকম না হয়। ছেলের কাঁধে যেন আর কোনো মা-বাবার লাশ না ওঠে।
ঘটনার দুই দিন পর এদিন সকালে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন আব্দুস সাত্তারের ছেলে আরিফ ইফতেখার ও মেয়ে সেলিনা সুলতানা। এরপর তারা রাতে থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন।

Manual4 Ad Code

বাসার গৃহকর্মীর প্রেমের বিষয় নিয়ে সেলিনা বলেন, কাজের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার মা-মারা গেছেন। একটা বাচ্চা মেয়ে, সে খুব ভালো ছিল, মেয়েটার কাছে কোনো মোবাইল ছিল না। মেয়েটা আমাদের কাছে আমানত ছিল। কেইসটা ঘুরানোর জন্য মেয়েটাকে দেখানো হচ্ছে। এটা সত্য কোনো ঘটনা না।
মামলা দায়েরের তথ্য নিশ্চিত করে কতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাঈনুল জাকির বলেন, নিহত দম্পতির মেয়ে একটি এজাহার জমা দিয়েছেন। এটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় দম্পতিসহ তিনজনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত বাবুল মিয়াকে (৪০) ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। পরে বিচারকের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গ্রেপ্তার বাবুলের বিষয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আরিফ ইফতেখার বলেন, আমরা ওয়েট করি, দেখি রিমান্ডে নেওয়া হোক, তদন্ত হোক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আপনারা সবাই জানেন, তিন দিন ধরে সিলেটে আলোচনা হচ্ছে। তদন্ত হোক। এ বিষয়ে পরে কথা বলব আপনার সঙ্গে।

শুক্রবার বাদ আসর নগরীর ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে নিহত দম্পতির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফিজ মাওলানা আসজাদ আহমদ।

Manual4 Ad Code

বুধবার সকালে রায়নগর এলাকায় মিতালী ১১১ নম্বর বাসার মালিক আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনার (১৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

Manual7 Ad Code

ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি রায়নগরে নিজের বাসায়ই থাকতেন। এই দম্পতির চার সন্তারে মধ্যে দুই সন্তান লন্ডনে ও দুই সন্তান আমেরিকায় থাকেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বেলা ৩টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা ও প্রয়াত নূর মিয়া ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথা স্বীকার করেন। ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে প্রেমের জেরে তিনজনকে বাবুল হত্যা করে বলে জানায় পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ।

শেয়ার করুন