Beanibazarer Alo

  সিলেট     বুধবার, ৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশৃঙ্খলা কীভাবে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে

admin

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০২:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০২:২৩ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
বিশৃঙ্খলা কীভাবে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে

Manual1 Ad Code

ড. সুলতান মাহমুদ রানা:
একসময় বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় একটি আশাবাদী ধারণা প্রচলিত ছিল। সেটি হলো, শীতল যুদ্ধের অবসানের পর পৃথিবী ধীরে ধীরে আরও শান্ত, আরও গণতান্ত্রিক এবং আরও সহযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। অনেক রাজনৈতিক তাত্ত্বিক মনে করেছিলেন, গণতন্ত্রের বিস্তার, বৈশ্বিক বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংঘাত কমবে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং উন্নয়ন হবে অধিকতর টেকসই। কিন্তু বাস্তবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে।

Manual2 Ad Code

আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো না কোনো রূপে দৃশ্যমান। কোথাও নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, কোথাও সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন, কোথাও সাংবিধানিক সংকট, কোথাও রাজনৈতিক মেরুকরণ, কোথাও আবার সামাজিক বিভাজন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই বারবার ব্যাহত হচ্ছে। সরকার পরিবর্তিত হচ্ছে, নতুন নেতৃত্ব আসছে, নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই জনগণ যে স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি কিংবা কার্যকর শাসনের প্রত্যাশা করে, তা অনেকটাই অধরা থেকে যাচ্ছে।

Manual1 Ad Code

এটি কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস কিংবা বেলজিয়ামের মতো দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যসম্পন্ন দেশগুলোও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক উত্তেজনা এবং নীতিগত অচলাবস্থার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।

ফলে একটা মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কি আজ বৈশ্বিক বাস্তবতার নতুন স্বাভাবিক রূপ? আর যদি তাই হয়, তবে এর মূল্য কে দিচ্ছে? উত্তরটি খুবই সহজ, রাষ্ট্র দিচ্ছে, অর্থনীতি দিচ্ছে এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষ দিচ্ছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বলতে কেবল সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বোঝায় না। বরং বোঝায় এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকে, আইনের শাসন বজায় থাকে, অর্থনীতি পূর্বানুমানযোগ্য থাকে এবং জনগণের আস্থা রাষ্ট্রের প্রতি অটুট থাকে।

বিপরীতভাবে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, নীতিনির্ধারণকে অনিশ্চিত করে এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ক্ষয় করতে শুরু করে।

বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্যাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিজ’-এ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তার মতে, কোনো সমাজে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যদি দ্রুত বৃদ্ধি পায় কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একই গতিতে শক্তিশালী না হয়, তাহলে গণতন্ত্রের পরিবর্তে অরাজকতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

তিনি এটিকে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বটি আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে আরও প্রাসঙ্গিক মনে হয়।

একটা মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কি আজ বৈশ্বিক বাস্তবতার নতুন স্বাভাবিক রূপ? আর যদি তাই হয়, তবে এর মূল্য কে দিচ্ছে? উত্তরটি খুবই সহজ, রাষ্ট্র দিচ্ছে, অর্থনীতি দিচ্ছে এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষ দিচ্ছে।
বিশ্বের বহু দেশে জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে, আন্দোলন করেছে, নির্বাচন করেছে, সরকার পরিবর্তন করেছে। কিন্তু পরিবর্তনের পর যদি প্রশাসন দুর্বল থাকে, বিচারব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম আস্থা না থাকে অথবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক সংঘাতের অংশে পরিণত হয়, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না। বরং সেই পরিবর্তন নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়।

Manual5 Ad Code

এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, Government Change is not equal to System Change। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তন মানেই রাষ্ট্রব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন নয়। যদি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনে পরিবর্তন না আসে, তবে ক্ষমতার পালাবদল কেবল রাজনৈতিক চরিত্র বদলায়; রাষ্ট্রের কার্যকারিতা বদলায় না। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটাল ভবনে হামলার ঘটনা বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে রাজনৈতিক পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং সাংবিধানিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর। যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে প্রতিপক্ষকে বৈধ রাজনৈতিক প্রতিযোগী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখা হয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হতে শুরু করে।

একইভাবে ফ্রান্সে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক অবসরভাতা সংস্কারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যদি পর্যাপ্ত সামাজিক সংলাপ না থাকে, তবে অর্থনৈতিক সংস্কারও তীব্র রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী অর্থনীতিও মাসের পর মাস ধর্মঘট, পরিবহন অচলাবস্থা এবং সহিংস বিক্ষোভের অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করেছে।

যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট ছিল গণতান্ত্রিকভাবে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় দেশটি কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংসদীয় অচলাবস্থা, একাধিক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় নীতিগত অনিশ্চয়তা, যেখানে ভবিষ্যতের নীতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বাজারকে প্রভাবিত করে।

জার্মানির মতো স্থিতিশীল রাষ্ট্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজনৈতিক বিভাজন, জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, অভিবাসন প্রশ্নে উত্তেজনা এবং উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইতালিতে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বহুবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। স্পেনে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা প্রশ্ন জাতীয় রাজনীতিকে দীর্ঘ সময় অস্থিতিশীল করে রেখেছিল।

এই উদাহরণগুলোর উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমালোচনা করা নয়। বরং একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরা। বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঊর্ধ্বে নয়। তবে পার্থক্য হলো, কিছু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এতটাই শক্তিশালী যে তারা সংকটকে সামাল দিতে পারে; আবার কিছু রাষ্ট্রে দুর্বল প্রতিষ্ঠান সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘পলিটিক্যাল অর্ডার অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডেকে’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে রাষ্ট্রের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়লে রাজনৈতিক মেরুকরণ দ্রুত প্রশাসনিক অকার্যকারিতায় রূপ নেয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংঘাত শুধু সংসদ বা রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে।

অন্যদিকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হলো কার্যকর প্রতিষ্ঠান। কারণ বাজার সবসময় স্থিতিশীলতা ভালোবাসে। ব্যবসায়ী জানেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা মানে নীতির অনিশ্চয়তা; নীতির অনিশ্চয়তা মানে বিনিয়োগের ঝুঁকি; আর বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং প্রবৃদ্ধিও কমে যায়।

সুতরাং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় শিকার শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল নয়; শিকার হয় সাধারণ মানুষ। কারণ রাজনৈতিক সংঘাতের খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করে করদাতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং নতুন কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা তরুণেরা।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, যেসব দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকে, সেসব দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়, দেশীয় বিনিয়োগ স্থবির হয়, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কখনোই একটি রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী অবস্থা হতে পারে না। কারণ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন, কূটনীতি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেসব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে থেকেও পরে স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, তারা সাধারণত কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংকট কাটিয়ে উঠেছে।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে রাজনৈতিক পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং সাংবিধানিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর।
অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস এ. রবিনসন তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হোয়াই নেশনস অ্যান্ড ফেইল’-এ দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তিমূলক, সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল থাকে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বলতে এমন ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্রের সম্পদ, সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

যখন একটি গোষ্ঠী মনে করে যে রাষ্ট্র তাদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করছে না বা তাদের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পাচ্ছে না, তখন রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়ে। তাই অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা, কার্যকর স্থানীয় সরকার, নীতিনির্ধারণে নাগরিক অংশগ্রহণ এবং সংখ্যালঘু মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি প্রতিযোগিতা, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি আপস ও আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে গণতন্ত্র সংঘাতে পরিণত হয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী আরেন্ড লাইপহার্ট তার ‘প্যাটার্ন অব ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে বহুদলীয় ও বৈচিত্র্যময় সমাজে ঐকমত্যভিত্তিক গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল। তার মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের পাশাপাশি সংখ্যালঘু মতামতের জন্যও রাজনৈতিক পরিসর নিশ্চিত করা জরুরি।

Manual3 Ad Code

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্মিলনের রাজনীতি বেছে নিয়েছিলেন। ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর মাধ্যমে অতীতের সংঘাতকে বিচার ও সংলাপের কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ না হলেও একটি গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, সংলাপ দুর্বলতার নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পরিপক্বতার লক্ষণ।

এ. ভি. ডাইসি তার ‘রুল অব ল’ তত্ত্বে বলেছেন, আইনের শাসনের অর্থ হলো, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতাও আইনের সীমার মধ্যে পরিচালিত হবে। যদি নাগরিকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হয় না, তাহলে রাষ্ট্রের বৈধতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায্য বিচার এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য। আইনের শাসন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার নয়; বরং সব পক্ষের জন্য সমান নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। যদি দলগুলোর ভেতরেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নেতৃত্ব নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা না থাকে, তাহলে জাতীয় পর্যায়েও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রার্থী মনোনয়ন, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং নীতিনির্ধারণে দলীয় সদস্যদের অংশগ্রহণ বাড়ানো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে।

ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুধু রাজপথে নয়; অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও তৈরি হয়। ভুয়া তথ্য, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দ্রুত সামাজিক বিভাজন বাড়াতে পারে। তাই তথ্য যাচাই, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং নাগরিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করা জরুরি।

ইউর্গেন হাবারমাস যুক্তি দিয়েছিলেন যে সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য একটি যুক্তিনির্ভর জনপরিসর অপরিহার্য। যখন তথ্যের পরিবর্তে গুজব জনমত গঠন করে, তখন গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশ্বের অনেক সফল গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন হলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, জলবায়ু অভিযোজন, জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো দৈনন্দিন দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের জাতীয় ঐকমত্য রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও আস্থা তৈরি করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কখনোই স্থায়ী সমাধান নিয়ে আসে না। টেকসই সমাধান আসে তখনই, যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং সংলাপের সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
sultanmahmud.rana@gmail.com

শেয়ার করুন