স্টাফ রিপোর্টার:
টানা ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চরম সংশয় আর অবিশ্বাসের মাঝেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা।
শনিবার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দুই দেশের প্রতিনিধিদের পৃথক বৈঠকের পর সন্ধ্যায় প্রথমবার সরাসরি এক টেবিলে বসেন দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা। টানা দুই ঘণ্টা তাদের এই আলোচনা চলে। মার্কিন হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরতে কালো পোশাক পরে এবং নিহত স্কুল শিক্ষার্থীদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে আসেন ইরানি প্রতিনিধিরা। হাইভোল্টেজ এ বৈঠকে মূলত সাতটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।
লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি, সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনি হরমুজ প্রণালির ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনড় ইরান। অন্যদিকে হরমুজকে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি চিরতরে বন্ধের শর্তে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের এ শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে খাদের কিনারা থেকে ফেরাতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেরেনা হোটেলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির এই আলোচনা দুই ঘণ্টা চলে। এরপর নৈশভোজের বিরতি দেওয়া হয়েছে।
আবার এ আলোচনা শুরু হবে। এ সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও উপস্থিত ছিলেন।
শুরুতে বলা হচ্ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন। তবে পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এটিকে বড় অগ্রগতি হিসাবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বিষয় আলোচনায় এসেছে। লেবানন ইস্যুতেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে।
কিছু সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, ইসরাইলের অভিযান এখন লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ থাকবে, বৈরুতে আর কোনো হামলা হবে না। ইরানের সূত্র অনুযায়ী, দেশটির আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ছাড়ে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন। তবে যেহেতু রুদ্ধদ্বার বৈঠক, তাই তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য যাচাই করা যায়নি। খবর রয়টার্স, আলজাজিরা, তাসনিম নিউজ, ডন, এএফপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
এর আগে শনিবার সকালে মার্কিন বিমানবাহিনীর দুটি বিশেষ বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন এই দলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তাদের স্বাগত জানান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।
অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল শুক্রবারই ইসলামাবাদে পৌঁছায়। সদ্য নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং যুদ্ধে নিহত অন্য ইরানিদের স্মরণে তারা কালো পোশাক পরে এসেছিলেন। মার্কিন হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে তারা নিহতদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে আসেন।
শান্তি আলোচনার আগে শনিবার দুপুরে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের প্রতিনিধিদল। এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে।
পরে এক বিবৃতিতে শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এ আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
পরে ইরানের প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনিরের সঙ্গেও বৈঠক করে। দুই বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিদল জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে।
নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় রেড জোন: এই হাইভোল্টেজ আলোচনাকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ মানুষের শহর ইসলামাবাদকে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে।
শহরের মোড়ে মোড়ে হাজার হাজার সেনাসদস্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং মূল কেন্দ্রটিকে রেড জোন হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
লেবাননে সংঘাত অব্যাহত: দক্ষিণ লেবাননে শনিবারও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত ছিল। বৈরুতের আকাশে ইসরাইলি ড্রোন এবং যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহও ইসরাইলি অবস্থানে একাধিক পালটা হামলা চালিয়েছে।