Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“চাঁদাবাজিতে জিরো টলারেন্স”

admin

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ | ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
“চাঁদাবাজিতে জিরো টলারেন্স”

Manual6 Ad Code

একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন এক নতুন ভোরের পথে যাত্রা শুরু করেছে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল ভয়, জুলুম ও শৃঙ্খলমুক্ত একটি কল্যাণমুখী সমাজ। বাংলাদেশে শাসনের খোলস বদলেছে, নতুন নেতৃত্ব এসেছে, কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো—রাজপথ, ফুটপাত, কাঁচাবাজার কিংবা শিল্পকারখানায় ‘চাঁদাবাজি’ এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং কোথাও কোথাও কেবল মুখ বদলেছে, কিন্তু নির্যাতনের ধরন ও অর্থের প্রবাহ রয়ে গেছে আগের মতোই। নতুন সরকারের প্রতি জনমনে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা রক্ষা করতে হলে চাঁদাবাজিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল নথিপত্রে নয়, কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো লাগামহীন দ্রব্যমূল্য। আর এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে সিন্ডিকেটের চেয়েও ভয়ংকর খলনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পরিবহণ খাতের পদ্ধতিগত চাঁদাবাজি। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি পণ্যবাহী ট্রাক দক্ষিণপূর্ব পার্বত্য চট্টগ্রাম বা উত্তর পশ্চিমের উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা পৌঁছাতে গড়ে ১০ থেকে ১২টি পয়েন্টে অবৈধ চাঁদার শিকার হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সিএবি)-এর সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ বলছে, পণ্য পরিবহণে বাড়তি খরচের কারণে সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার এই অবৈধ চাঁদা বন্ধ করা না গেলে বাজারের আগুন নেভানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না, অথচ ভোক্তা কিনছে অগ্নিমূল্যে—এই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যই এখন রাষ্ট্রের প্রধান শত্রু।

ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে হাঁটতে গিয়ে দেশবাসী বিগত সময়ে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজির’ও সম্মুখীন হয়েছে। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালগুলোর আশেপাশেও চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট সক্রিয়। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে ভর্তির সময় দালালি—এগুলোও চাঁদাবাজিরই ভিন্ন রূপ। সাধারণ মানুষ যখন জীবন-মরণ সংকটে হাসপাতালে যায়, সেখানেও যদি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হতে হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের মানবিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

Manual7 Ad Code

নতুন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটি সমন্বয়ধর্মী কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর অটল ঘোষণা। নতুন সরকার গঠনের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, “বিগত সময়ের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া হবে না। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক, জুলুম করলে তাকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে পরিবহন খাত এবং পাইকারি বাজারগুলোতে যারা হানা দিচ্ছে, তাদের সমূলে উৎপাটন করতে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে, নিত্যপণ্যের সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে রাস্তার চাঁদাবাজিই প্রধান বাধা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যারা পণ্যবাহী ট্রাকে হানা দেয়, তারা মূলত দেশের অর্থনীতির শত্রু।

Manual3 Ad Code

সময় পাল্টেছে। যারা ভাবছেন ‘বড় ভাই’ বা ‘রাজনৈতিক ট্যাগ’ ব্যবহার করে মানুষের ঘাম ঝরানো পয়সা হাতিয়ে নেবেন, তারা জেনে রাখুন—পতন অনিবার্য। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, গণবিরোধী কোনো শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।  চাঁদাবাজি তখনই ডালপালা মেলে, যখন সমাজ নীরব থাকে। যুগের পর যুগ আমরা ভয় পেয়ে পকেট খালি করেছি, কিন্তু এবার সময় এসেছে সম্মিলিত প্রতিরোধের। কোথাও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলে ভয় না পেয়ে সাথে সাথে প্রশাসনকে অবহিত করুন। এলাকার সচেতন শিক্ষিত যুবসমাজ ও ছাত্র সমাজকে সাথে নিয়ে ‘চাঁদাবাজমুক্ত জোন’ গড়ে তুলুন। আপনার নীরবতা মানেই একজন অপরাধীর সাহস বাড়িয়ে দেওয়া।

Manual5 Ad Code

স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য এবং সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটা স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠণ করে তাতে নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে (যেমন: শিল্পাঞ্চল বা প্রধান ইন্টারসেকশন) সেনাবাহিনীর সহযোগিতা গ্রহণ করা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের সিস্টেম্যাটিক চাঁদাবাজি উপড়ে ফেলতে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই ‘যৌথ কমান্ড’ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কেবল দৃশ্যমান চাঁদাবাজ নয়, পর্দার অন্তরালে থাকা গডফাদারদের চিহ্নিত করতে ডিজিএফআই, এনএসআইসহ বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করে যারা তাদের তালিকা করে সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

Manual6 Ad Code

পুলিশ ও র্যা বের ভেতর যারা চাঁদাবাজদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করে বা মাসোহারা নেয়, তাদের বিরুদ্ধেও ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাতে হবে। অবিলম্বে একটি কেন্দ্রীয় ‘চাঁদাবাজি বিরোধী হেল্পলাইন’ চালু করা প্রয়োজন। সড়ক আইন সংশোধন করে ‘সমঝোতা’ বা ‘সংগঠনের নামে’ নগদ টাকা উত্তোলন নিষিদ্ধ করতে হবে। টোল ও পণ্য কেনাবেচার লেনদেন ডিজিটাল করা হলে চাঁদাবাজদের সুযোগ কমবে।

পরিশেষে বলা যায়, চাঁদাবাজি কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে, উদ্যোক্তা নির্ভয়ে বিনিয়োগ করবে এবং সাধারণ মানুষ শান্তিতে ঘুমানোর অধিকার পাবে।

শেয়ার করুন