Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টিকার অব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ

admin

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৩৮ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
টিকার অব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ

Manual5 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

Manual2 Ad Code

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাত এক গভীর সংকটের সম্মুখীন হইয়াছে, যাহা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নহে, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন লইয়া ছিনিমিনির শামিল। গতকাল প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দেশের রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আজ ধ্বংসের কিনারে উপনীত। টিকার অব্যবস্থাপনা এবং অপারেশন প্ল্যান (ওপি) আকস্মিক বন্ধ করিয়া দেওয়ার ফলে ১১টি মারাত্মক রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়াছে এবং অন্তত ২৬টি সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ দেশ জুড়িয়া ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কা তৈরি হইয়াছে।জানা যায়, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ব্যাহত হইবার কারণে বর্তমানে শিশুদের মধ্যে হাম ও রুবেলার প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। প্রতিদিনই হামে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাইতেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) প্রকাশিত ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী গত ১৫ মার্চ হইতে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত হামে ৩৭ জনের মৃত্যু হইয়াছে। হামের উপসর্গ লইয়া মৃত্যু হইয়াছে ২১১ জনের। হামের উপসর্গ লইয়া এই সময় ২১ হাজার ৪৬৭ জন রোগী হাসপাতালের শরণাপন্ন হয়। বর্তমানে হামে আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ হইতে ছয় মাসের শিশুদের সংখ্যাই অধিক। কারণ তাহারা সময়মতো দুই ডোজ টিকা অর্থাৎ ৯ মাস বয়সে এবং ১৫ মাসের সময় টিকা পায় নাই। এই জন্য হামে সংক্রমণের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় বহুগুণ অধিক বলিয়া দাবি করিতেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ। তবে কেবল হাম নহে, টিকার অভাবে যক্ষ্মা (বিসিজি), পোলিও, নিউমোনিয়া (পিসিভি) এবং হেপাটাইটিস-বি-এর মতো রোগের সুরক্ষাবলয়ও আজ ছিন্নভিন্ন হইয়া পড়িয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।

স্বাস্থ্য খাতের এই স্থবিরতা কেবল টিকাদানেই সীমাবদ্ধ নহে; অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও সমানভাবে উদ্বেগজনক। গত এক বছর যাবৎ ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের রাতকানা রোগের ঝুঁকি বাড়িয়াছে। কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বন্ধ হওয়ায় প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু পড়িয়াছে সংক্রমণের মুখে। ম্যালেরিয়াপ্রবণ ১৩টি জেলায় মশারির অভাব ও রোগ নির্ণয় বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হইয়া উঠিতেছে। ইতিমধ্যে ম্যালেরিয়ায় বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমানের মৃত্যু হইয়াছে। ইহা ছাড়া ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, কালাজ্বর এবং টাইফয়েডের মতো রোগের বিস্তার প্রতিরোধের সকল পথ প্রায় রুদ্ধ। অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন-ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ প্রান্তিক পর্যায়ে মিলিতেছে না, যাহা জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিসাধন করিতেছে।

Manual1 Ad Code

এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি হইতে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করিয়া জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রথমত, ইউনিসেফ ও গ্যাভির (GAVI) ন্যায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সহিত সমন্বয় সাধন করিয়া জরুরি ভিত্তিতে টিকার মজুত নিশ্চিত করিতে হইবে। কেনাকাটার অজুহাতে আর একটি দিনও যেন টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ না থাকে। দ্বিতীয়ত, স্থগিত হইয়া থাকা অপারেশন প্ল্যান (ওপি) এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) দ্রুততম সময়ের মধ্যে একনেকে অনুমোদন করিয়া অর্থায়ন নিশ্চিত করিতে হইবে। তৃতীয়ত, মাঠ পর্যায়ের ২৫ হাজারেরও অধিক স্বাস্থ্যকর্মীর বকেয়া বেতন পরিশোধ করিয়া তাহাদের পুনরায় কাজে উদ্দীপ্ত করিতে হইবে, নতুবা টিকাদান ও জনসচেতনতা কার্যক্রম সফল করা অসম্ভব। চতুর্থত, যক্ষ্মা, এইচআইভি এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগের কিট ও ঔষধের সরবরাহ সচল রাখিতে জরুরি তহবিল গঠন করিতে হইবে।পরিশেষে আমরা মনে করি, সরকারের নীতিনির্ধারণী ভুলের মাশুল সাধারণ মানুষ নিজের জীবন দিয়া দিতে পারে না। স্বাস্থ্য খাত কোনো গবেষণাগার নহে যে সেইখানে পরীক্ষানিরীক্ষা চালাইয়া সেবা বন্ধ রাখা চলিবে। বর্তমান সরকারকে পূর্ববর্তী ভুলের দায়ভার গ্রহণ করিয়া অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় এই অবহেলার জন্য তাহাদেরও জবাবদিহি করিতে হইবে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নহে, বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

Manual8 Ad Code

শেয়ার করুন