Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘যত টেকা লাগে আমারে ইকান থাকি বার কর, আমি বাঁচতাম নায়’

admin

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪৬ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
‘যত টেকা লাগে আমারে ইকান থাকি বার কর, আমি বাঁচতাম নায়’

Manual1 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

স্বপ্নের ইউরোপে পাড়ি দিতে চার মাস আগে দালালদের মাধ্যমে ঘর ছাড়েন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁওয়ের বাসিন্দা শায়েক আহমদ। বৃদ্ধ বাবা আখলুস মিয়া জমি বিক্রি করে টাকা তুলে দেন দালালদের হাতে।

৪ মাস শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই, মিশর, লিবিয়া নানা দেশে ঘুরানো হয় শায়েককে। অবশেষে ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ভূমাধ্যসাগর হয়ে গ্রিসে যাওয়ার জন্য নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। সেখানেই ২৪ মার্চ প্রাণ হারান শায়েক।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় অবর্ণনীয় কষ্ট। সেখান থেকে ইউরোপ যেতে অবৈধ সাগরপথে পাড়ি দেওয়ার জন্য আবারও সাড়ে ৭ লাখ টাকা দাবি করে দালালরা। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জমি বিক্রয় করে সেই টাকা দেন বাবা আখলুস মিয়া।

Manual1 Ad Code

কেবল শায়েক আহমদ নয়, ছোট্ট নৌকায় করে ভূমধ্যসাগরে ঘুরতে ঘুরতে খাবার ও পানির অভাবে মারা ১৮ বাংলাদেশি অভিভাসন প্রত্যাশী। যাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের। এছাড়া নৌকা উদ্ধার করা হয়েছে আরও ২২ বাংলাদেশিকে।
পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে গিয়ে লাশ হয়ে যাওয়া এই যুবকদের বাড়িতে এখন কেবলই আহাজরি। কান্না যেনো থামছেই না স্বজনদের।

সাগর পথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার এই ভয়ঙ্কর যাত্রাকে মানবপাচারকারীদের ভাষায় বলা হয় ‘গেম’। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক তরুণ নিয়ে ইউরোপ যেতে এই ‘গেম’-এ চড়েন। বেকারত্ব ও দারিদ্রতাকে পুঁজি করে একটি দালালগোষ্ঠি চড়ে অংকের টাকা নিয়েও তরুণদের ঠেলে দেয় এই মৃত্যুর খেলায়।

২১ মার্চ এই ‘গেম’ হয় শায়েকদের। তার আগে ২০ মার্চ তিনি কথা বলেন পরিবোরের সাথে। সেসময় টাকা দিয়ে হলেও তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আর্জি জানান। ফোনে জানান, নির্যাতন করা হচ্ছে, অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছে। বাবাকে অনুরোধ করেন, ২৩ মার্চের মধ্যে যদি নৌযানে রওনা দিতে না পারেন, তাহলে যেন তাকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

শায়েক আহমদের সাথে এসব আলাপের কিছুটা ফোনে রেকর্ড করে রাখেন তার পরিবারের সদস্যরা। এরকম একটি অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, শায়েক তার পরিবারের সদস্যদের বলছেন, ৫০, ৬০ বা ৭০ হাজার যত টাকা লাগে তাাদেরকে দেও। দিয়ে আমাকে উদ্ধার কর। না হলে আমি বাঁচবো না।

শায়েখের বাবা আখলুস মিয়া বলেন, এই আলাপের পরদিনই ‘গেমে’ তুলে দেওয়া হয় শায়েককে। এরপর আর তার সাথে যোগযোগ করা যায়নি। কালকে ( শনিবার) মৃত্যুর খবর পেয়েছি।

কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, দলাল আমার ফুত নাইমরে সাগরো ফালাইয়া মারিলিছে। তোমরা তারে আইন্যা দেও। তোমরা দলালের বিচার করো।’

শুধু শায়েক আহমদ একা নন, লিবিয়া থেকে ছোট নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ জন। সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবাই তরুণ। গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তাঁরা। সাগরে পথ হারিয়ে ছয় দিন ছিলেন। অনাহারে তাঁরা মারা যান। পরে সঙ্গীরা লাশ ভাসিয়ে দেন সাগরে। শুক্রবার গ্রিস উপকূল বোটে থাকা জীবিতদের উদ্ধার করে সে দেশের কোস্টগার্ড।

Manual4 Ad Code

আঁখি বেগমের ছেলে নাইম মিয়া অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলেন। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে কয়েকজনের সঙ্গে নাইমও ভূমধ্যসাগরে মারা যান। শনিবার তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার।

তার পর থেকেই দিনরাত ছেলের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন আঁখি বেগম। তার গগনবিদারি চিৎকারে সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশী ও স্বজনরাও কাঁদছিলেন। তারা নীরবে চোখের জল ফেলছিলেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ১২ জনের মৃত্যুর খবর তারা জানতে পেরেছেন। এর মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মোট ছয়জন মারা গেছেন।

এ ছাড়া দিরাই উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজনের মৃত্যুর সংবাদ এসেছে।

Manual8 Ad Code

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার বলেন, বেসরকারি নানা মাধ্যম থেকে খবর পেয়ে আমরা ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। আমরা আরো তথ্য সংগ্রহ করছি। দালাল হিসেবে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Manual4 Ad Code

প্রশাসন যাদের মৃত্যুর খবর পেয়েছে তারা হলেন- জগন্নাথপুরের চিলাউড়া শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), একই গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ জনি (২৫), পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম) গ্রামের প্রাক্তন শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২), দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের সাইদ সরদারের ছেলে নূরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫), আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ররনারচর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে যুবদল নেতা মজিবুর রহমান (৩৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমান (২৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (৩০)।

এ ছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিমও মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামে যুবকদের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। মা-বাবা, ভাই-বোনেরা বিলাপ করছেন।

নাইম মিয়ার মা আঁখি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, “আমার ফুতরে মারিলাইছে দলালে। আমি দলালের বিচার চাই। আমার মতো আরো অনেক মার বুক খালি করছে দলাল। দলালের কঠিন বিচার চাই আমি।”

নাইম মিয়ার পিতা দোলন মিয়া বলেন, “গ্রামের আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকায় আমার ছেলেকে লিবিয়া হয়ে গ্রিস নেওয়ার চুক্তিতে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর লিবিয়ায় জিম্মি করে আরো পাঁচ লাখ টাকা নেয়।

“২১ মার্চ তাকেসহ ট্রলারে অনেকজনকে নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। এখন শনিবার খবর পেয়েছি, আমার ছেলে মারা গেছে। দালাল আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।”

যেসব যুবক মারা গেছে বলে খবর এসেছে, তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এক থেকে পাঁচ মাস আগে অবৈধভাবে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা এ পথে যাত্রা করেন। সমুদ্রে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা মারা গেছেন। পরে তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

পুলিশ বলছে, গ্রিসের উপকূলের একটি দ্বীপের কাছে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ছাড়া মানবপাচারকারী চক্রের নৌকা আটকের পর শনিবার এই হতাহতের বিষয়টি সামনে আসে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, “সুনামগঞ্জের যেসব যুবক লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে সাগরে মারা গেছেন তাদের বিষয়ে তথ্যের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছি। পাশাপাশি দালালদের তালিকা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শেয়ার করুন