Beanibazarer Alo

  সিলেট     মঙ্গলবার, ৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণহীন এলপিজির বাজার : বেশি দামেও মিলছে না সিলিন্ডার

admin

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:৫১ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৩:৫১ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
চট্টগ্রামে নিয়ন্ত্রণহীন এলপিজির বাজার : বেশি দামেও মিলছে না সিলিন্ডার

Manual3 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি:
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডার। সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না অনেক বিক্রেতা। অথচ অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারি নেই বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দারা। এর মধ্যে সরবরাহ সংকট ও নতুন করে দাম বাড়ায় রান্নার গ্যাস নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা।

দেশে এলপিজির আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও চট্টগ্রামের বাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে সংকট চলছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও বেশি দাম দিয়েও গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রোববার (৪ অক্টোবর) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮১০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাজারে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ লাখ ৪৮ হাজার টন। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন বা ৩৩ শতাংশ।

Manual3 Ad Code

এলপিজির প্রধান দুটি উপাদান বিউটেন ও প্রোপেনের আমদানিও বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিউটেন আমদানি হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার ৬৭২ টন। চলতি বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৮২ হাজার ৫৮ টনে, যা প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে প্রোপেন আমদানি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৭৩ টন, যা প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আমদানি বাড়লেও চট্টগ্রামের বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

Manual3 Ad Code

নগরের বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও লালখান বাজারের বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

নগরের রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা মামুনুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ আগে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন। এখন একই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়। তার অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। এতে সাধারণ ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

Manual7 Ad Code

চকবাজার এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, বাজারে প্রকাশ্যে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি চোখে পড়ছে না। নিয়মিত বাজার অভিযান ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম আদায় করছেন। ফলে একদিকে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।

চট্টগ্রামে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মুজিবুল হক বলেন, সকালে শুধু ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার ছিল। পরে সেটিও শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতা বেশি দাম দিতেও রাজি ছিলেন। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় কাউকে সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব হয়নি।

বহদ্দারহাট এলাকার সিলিন্ডার বিক্রেতা আব্দুল মুমিন বলেন, ডিলারদের কাছে গ্যাস চেয়েও পাচ্ছি না। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি কিনেও রশিদ ছাড়াই লেনদেন করতে হচ্ছে। আমরা কম দামে কিনতে পারলে গ্রাহক পর্যায়ে কম দামে বিক্রি করতে পারে। এখন আমারও নিরুপায়।

Manual5 Ad Code

চট্টগ্রামে এলপিজির চাহিদা বাড়ার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন খাতে গ্যাসের সংকট তৈরি হচ্ছে। অনেক গ্রাহক বিকল্প হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন। এতে সিলিন্ডারের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

তবে দেশে এলপিজির ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছে বিইআরসি। সংস্থাটির উপপরিচালক (গ্যাস) ফিরোজ জামান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে চাহিদার বিপরীতে এলপিজির ঘাটতি নেই। এনবিআরের তথ্যের ভিত্তিতে আমদানি ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ হিসাব করে দাম নির্ধারণ করা হয়।

বাজারে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, এলপিজি সরবরাহকারীদের ওপর তদারকি বাড়ানো হয়েছে। গতকালও আমাদের অভিযান হয়েছে। সরবরাহকারীদের দাবি, কোম্পানি পর্যায় থেকে তাদের বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। কোম্পানিরা ভাউচার দিচ্ছে না। বেশি দামে কিনে ভাউচার না পাওয়ায় ডিলারেরা ভাউচার ছাড়া গ্যাস বিক্রি করছে।

তিনি বলেন, আমরা ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। শিগগিরই বাজার তদারকির বিষয়টি আরও জোরদার করা হবে।

আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহ সংকট, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় এবং নতুন করে মূল্যবৃদ্ধিতে চট্টগ্রামের এলপিজি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। একদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতিতে বিকল্প জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে বাজার তদারকির দুর্বলতার অভিযোগে ভোক্তাদের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক করা, সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।

শেয়ার করুন