Beanibazarer Alo

  সিলেট     মঙ্গলবার, ১১ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ২৭শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম: বাংলাদেশি নাবিক

admin

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ফলো করুন-
মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম: বাংলাদেশি নাবিক

Manual4 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

Manual5 Ad Code

বেলা ১১টার দিকে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে জাহাজ কেঁপে ওঠে। দ্রুত লাইফ জ্যাকেট পরে ইঞ্জিনকক্ষে ছুটে যাই। দেখি, সেখানে সব ঠিক আছে। এরপর দৌড়ে ওপরে ডেকে উঠে দেখি, ক্রেনের নিচে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তখনই বুঝতে পারি মিসাইল আক্রমণের শিকার হয়েছে জাহাজটি। দেরি না করে নিজেদের নিরাপদ করতে সবাই জাহাজের ওপরে অ্যাকোমডেশন কক্ষে ঢুকে পড়ি। এর পরপরই আমাদের পেছনে আরেকটি মিসাইল আঘাত হানে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বেঁচে যাই। তবে নাবিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।’

আরব সাগরে পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি গোল্ড অটাম’ জাহাজে মিসাইল হামলার শুরুর মুহূর্ত এভাবেই বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশি নাবিক এহসান সাবরি রিহাদ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির আগের দিন, গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হামলার মুখে পড়ে জাহাজটি। চীনের সাংহাই থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজটি ওমানের সোহার বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। তখন সেটি আরব সাগরে, গন্তব্যবন্দর থেকে প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল। জাহাজটিতে এহসান সাবরিসহ বাংলাদেশের ৬ জন, চীনের ১১, ইন্দোনেশিয়ার ৩ এবং মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের ১ জন করে নাবিক ছিলেন।কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা এহসান সাবরি রিহাদ ১০ মাস আগে ইঞ্জিন ক্যাডেট হিসেবে এই জাহাজে যোগ দিয়েছিলেন। কর্মজীবনের প্রথম সমুদ্রযাত্রা শেষ না হতে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তিনি। তবে হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরের বাইরে আরব সাগরে থাকা অবস্থায় কারা জাহাজটিতে হামলা করল, তা এখনো বুঝে ওঠতে পারেননি নাবিকেরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি, ওমান উপসাগর এলাকা যুদ্ধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হোয়াটসঅ্যাপে এহসান সাবরি বলেন, ‘অ্যাকোমডেশন কক্ষে ঢোকার পরও জাহাজে একের পর এক আঘাতের বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কয়েকটি আঘাতের পর জাহাজের চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সবশেষ আঘাতে জাহাজের এক পাশে গর্ত তৈরি হয় এবং মূল ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর হামলা থেমে যায়।’

Manual4 Ad Code

এহসান সাবরির ভাষ্য, জাহাজের পেছনের ডেক ছাড়া মোটামুটি সব অংশেই তখন আগুন জ্বলছিল। ডেকে পণ্য হিসেবে বড় বাস ছিল, যেগুলো আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। নাবিকেরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে সবাই জাহাজের পেছনের ডেকে জড়ো হন। একই সঙ্গে ইঞ্জিন সচল করার চেষ্টাও চলতে থাকে। কিন্তু বেলা একটা পর্যন্ত চেষ্টা করেও ইঞ্জিন চালু করা যায়নি।আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকায় একপর্যায়ে ক্যাপ্টেন জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। তখন নাবিকেরা লাইফবোটে নামার প্রস্তুতি নেন। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি লাইফবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্য একটি লাইফবোটে রিহাদসহ ৪ জন উঠতে সক্ষম হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার ৩ নাবিক। জাহাজের অন্য ১৮ জন তখনো পেছনের ডেকে অবস্থান করছিলেন। জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও উত্তাল থাকায় সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

Manual3 Ad Code

লাইফবোটে নামার পর শুরু হয় আরেক দুঃসহ সময়। এহসান সাবরি বলেন, বোমার আঘাতে লাইফবোটের ইঞ্জিনও অচল হয়ে যায়। এর মধ্যে সাগর ছিল উত্তাল। ঢেউয়ের পানি লাইফবোটে ঢুকছিল। সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

‘অচল লাইফবোটটা ঢেউয়ের মধ্যে দুলছিল। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক ছিল। কয়েক দফা বমি করেছি। মনে হচ্ছিল, আজকেই শেষ দিন। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। বেঁচে ফেরা হয়তো আর হবে না। ভয়ে দোয়া ইউনুস পড়তে থাকি,’ বলতে থাকেন তিনি।রিহাদ জানান, পরে তাঁরা লাইফবোট থেকে আকাশে ফ্লেয়ার ছুড়ে সাহায্য চান। প্রায় সাত ঘণ্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে এমভি ইউনাইচ নামের একটি জাহাজের দেখা পান। বইঠা বেয়ে জাহাজটির কাছাকাছি যান তাঁরা। পরে রশির সিঁড়ি বেয়ে তাঁরা জাহাজটিতে ওঠেন। সেখানে উঠে অন্য নাবিকদের অবস্থার কথা জানান। তবে গোল্ড অটামে আগুন থাকায় খুব কাছে যেতে পারেনি উদ্ধার-সহায়তায় আসা জাহাজটি।রিহাদ আরও বলেন, ‘পরে এমভি ইউনাইচ জাহাজ থেকে স্যাটেলাইট ফোনে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমরা। কোম্পানি থেকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে দেশটির নৌবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়। রাত ১টার দিকে পাকিস্তান নৌবাহিনী ঘটনাটি জেনে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। প্রায় সাত ঘণ্টা পর, বুধবার সকাল আটটার দিকে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন এসে প্রথমে পরিত্যক্ত জাহাজে আটকে থাকা ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে জাহাজের আগুনও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। জাহাজটি সঙ্গে সঙ্গে ডুবে না যাওয়ায় ক্যাপ্টেনসহ ৪ জন পরিত্যক্ত জাহাজেই থেকে যান। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের নাবিক মাজহারুল আবেদীন শাওনও রয়েছেন।’ সাগর শান্ত হলে সাহায্যকারী জলযান দিয়ে টেনে ওমানের উপকূলে নেওয়া হবে জাহাজটি, সেই আশায় তাঁরা থেকে যান।

পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে ১৪ জনকে উদ্ধারের পর পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজটি এমভি ইউনাইচ থেকে চারজনকেও উদ্ধার করে। এই ১৮ জনকে নিয়ে গতকাল বেলা দুইটায় করাচি বন্দরে পৌঁছায় পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজটি। এহসান সাবরি ছাড়াও এই দলে ছিলেন বাংলাদেশি নাবিক তাওহীদুর রহমান, আবদুল্লাহ আল মারুফ, সৈকত পাল ও রিয়াদ হোসেন। জাহাজেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় নাবিকদের।

দুর্ঘটনা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর এহসান সাবরি যোগাযোগ করেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘উদ্ধারের পর নাবিকদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। সবাই নিরাপদে আছে। নাবিকেরা যাতে নিরাপদে দেশে ফিরতে পারে সে জন্য আমরা কাজ করছি।’

Manual7 Ad Code

শেয়ার করুন