নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেটে বেড়েছে খুনোখুনি। তুচ্ছ ঘটনায় একজন কেড়ে নিচ্ছেন অন্যজনের প্রাণ। ঘাতকের তালিকায় উঠে আসছে স্বজনদের নামও। গত ২২ দিনে সিলেট বিভাগে অন্তত ১৭টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ খুনোখুনি বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, জড়িতরা অধরা থাকা এবং সর্বোপরি সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এরকম ঘটনা দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে সীমান্তবর্তী সুনারতনপুঞ্জি এলাকা দিয়ে একটি টাটা পিকআপে করে ভারতীয় জিরা নিয়ে আসছিল চোরাকারবারিরা। এ সময় সুরইঘাট বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা পিকআপটি আটক করতে পেছন থেকে ধাওয়া করেন। এসময় বিজিবির ধাওয়া খেয়ে জিরাবোঝাই চোরাকারবারিদের পিকআপের ধাক্কায় গুরুতর আহত ফারুক আহমদ (৬৫) মারা গেছেন। বুধবার ভোররাতে (১৯ আগস্ট) রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। নিহত ফারুক আহমদ কানাইঘাট সদর ইউনিয়নের আগ্রীপাড়া গ্রামের মৃত মতসিন আলীর ছেলে। পেশায় তিনি একজন দিনমজুর ছিলেন।
গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় তিনখুনের ঘটনা ঘটে। ওইদিন সকালে নিজ বাসায় খুন হন আওয়ামী লীগ নেতা ও সিলেট চেম্বারের সাবেক পরিচালক এমএ সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা।
লোমহর্ষক এ ঘটনার পর রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়া নামের এক শ্রমজীবীকে আটক করে পুলিশ। গৃহকর্মী তাহমিনার সাথে প্রেমের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব থেকে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ দাবি করলেও সেটা মানতে নারাজ নিহতের পরিবার। খুনের ধরণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় স্থানীয় লোকজনও পুলিশের বয়ানে সন্তুষ্ট নয়। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আসল ক্লু এখনো উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। বাবুল ছাড়া আর কেউ গ্রেফতারও হয়নি।
একই দিন সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে দুই শিশুসন্তানকে হত্যার ঘটনায় কামরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কামরুল দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া গ্রামের মধুপুরের আব্দুল কাদিরের ছেলে। দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানান, পারিবারিক বিরোধের জেরে কামরুল ইসলাম তার দুই শিশুসন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যা করেছে।
১৫ আগস্ট সিলেটের গোয়াইনঘাটে ধর্ষনের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করায় অভিযুক্তের পিতার দায়ের কোপে প্রাণ হারাণ কলিম উল্লাহ (৫৩) নামের এক বৃদ্ধ। উপজেলার পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের লাফনাউট দিঘিরপাড় গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। কলিম উল্লাহ’র ঘাতক ছয়ফুল্লাহ তাঁর আপন বড়ভাই।
একই দিন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দাসের বাজার ইউনিয়নের পূর্ব শংকরপুরে খুন হন ইউপি সদস্য আবদুল হক (৫০)। একইদিন বিকালে তাহিরপুরের বালিয়াঘাটে পিটিয়ে আল আমিন (৩৮) নামের এক যুবককে খুন করা হয়। শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে খুনের ঘটনাটি ঘটে। ১৪ আগস্ট দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে নিজ ঘরে খুন হন মোহাম্মদ আলী (৭৫) নামের এক বৃদ্ধ।
পুলিশের দাবি, বিদেশে থাকা ছেলে ইসমাইল মিয়া স্ত্রীর মাধ্যমে ভাড়াটে খুনি দিয়ে পিতাকে খুন করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ পুত্রবধূসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। ১১ আগস্ট জৈন্তাপুরের নিজপাট ইউনিয়নের নয়াগাত্তি গ্রামের গোলাম রফিক তার স্ত্রী জেসমিন বেগমকে (২৩) খুন করে। ২৮ জুলাই দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম মুক্তারপুরে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে বাতির আলী (৩০) নামের এক যুবককে তার প্রতিবেশিরা খুন করে।
২৭ জুলাই রাতে কাজিরবাজার সেতুর দক্ষিণপ্রান্তে ফুটবল খেলা নিয়ে স্কুলছাত্র রিফাত আহমেদ (১৫) খুন হয়। একইদিন সিলেট সদর উপজেলার হাটখোলায় জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে আব্দুল্লাহ (২৫) নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়। ওইদিন বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের পাঠানেরগাঁও গ্রামের মকরম আলীর (৬৮) লাশ নিজ বাড়ির অদূরে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. মনজুরুল আলম (মিডিয়া) বলেন, রায়নগরের ট্রিপল মার্ডারসহ মহানগরীতে ঘটে যাওয়া সকল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত
চলছে। তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেফতারেও পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত আছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে সিলেটে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া সামাজিক, পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে মানুষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতেও তোয়াক্কা করছে না। এজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।