Beanibazarer Alo

  সিলেট     রবিবার, ১লা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

admin

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০১:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০১:২৮ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

Manual2 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:
চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু কূটনৈতিক বন্ধুত্ব বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে অভিন্ন স্বার্থ। ‘কারাকোরাম ২০২৬’ নামের সামরিক সহযোগিতা এ সম্পর্ককে আরও নিবিড় করেছে। ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা, কাশ্মীর প্রশ্ন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে এ সহযোগিতার তাৎপর্য দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত নিরাপত্তা সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব রাখে।

Manual6 Ad Code

কারাকোরাম ২০২৬-এর তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই এর সামরিক বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করা দরকার। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১০ অক্টোবরের ঘোষণায় চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের কোরলা শহরে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী যৌথ প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার তথ্য জানানো হয়। এ প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। এতে ড্রোন পরিচালনা, চলন্ত অবস্থায় লক্ষ্য শনাক্ত ও আঘাত, দূরপাল্লার স্নাইপিং, যৌথ কমান্ড এবং সরাসরি সেনা-অংশগ্রহণমূলক মহড়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একে দুই দেশের সেনাবাহিনীর প্রথম যৌথ প্রশিক্ষণ হিসাবে বর্ণনা করেছে। ২২ অক্টোবর নয় দিনের এ মহড়া শেষ হয়।

এই প্রথম যৌথ সেনা প্রশিক্ষণ ছাড়াও চীন-পাকিস্তান বহু বছর ধরে সামরিক সহযোগিতা করে আসছে। দুই দেশের বিমানবাহিনীর ‘শাহিন’ এবং নৌবাহিনীর ‘সি গার্ডিয়ান’ মহড়া সেই সহযোগিতার পরিচিত উদাহরণ। সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণের জন্য ‘ওয়ারিয়র’ সিরিজও চালু রয়েছে। কিন্তু কারাকোরাম ২০২৬-এ নিয়মিত স্থলবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং যৌথ কমান্ড ও সমন্বিত অভিযানের অনুশীলন সামরিক সম্পর্ককে ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এতদিন অস্ত্র সরবরাহ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিশেষায়িত ইউনিটের প্রশিক্ষণ ছিল সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র। এখন দুই দেশের সেনাবাহিনী কীভাবে একই অভিযানে কাজ করতে পারে, সেই সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

Manual4 Ad Code

চীন-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি হলো পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২১-২০২৫ সময়ে চীনের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৬১ শতাংশ পেয়েছে পাকিস্তান। এ পরিসংখ্যান দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গভীরতা বোঝায়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, বিমান, নৌযান, ড্রোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিতে চীনা সরঞ্জামের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিচিতি ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।

কারাকোরাম ২০২৬-এ ব্যবহৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামও এ সম্পর্কের একটি দিক প্রকাশ করে। চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণে টাইপ ১৯১ রাইফেল, টাইপ ২০১ স্কোয়াড মেশিনগান, টাইপ ১১ সাঁজোয়া যান, টাইপ ০৮ পদাতিক যুদ্ধযান, আর্টিলারি, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে। এসব সরঞ্জাম চীনের সরবরাহ করা হয়েছিল বলে চীনা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অস্ত্রের সংখ্যা বা ধরন নয়। বরং একই অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করে দুই দেশের সেনারা কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। আধুনিক যুদ্ধে একটি বাহিনীর শক্তি শুধু উন্নত অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। সেনাদের প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, কমান্ড কাঠামো এবং বিভিন্ন ইউনিটের পারস্পরিক সহযোগিতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাহিনী অন্য দেশের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু যৌথ অভিযানে কার্যকর হতে হলে তার কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্যও প্রয়োজন।

কারাকোরাম ২০২৬ সেই সামঞ্জস্য তৈরির একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র। এ প্রক্রিয়াকে সামরিক পরিভাষায় বলা হয় ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা আন্তঃকার্যক্ষমতা। অর্থাৎ, ভিন্ন দেশের সামরিক ইউনিট যেন একই অভিযানে যোগাযোগ, পরিকল্পনা, নির্দেশনা এবং কার্যক্রম সমন্বয় করতে পারে। এটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক একীভূতকরণ নয়। দুই দেশের সেনাবাহিনীর পৃথক কমান্ড, জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই আন্তঃকার্যক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তাই কারাকোরাম ২০২৬-কে চীন-পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট প্রতিষ্ঠার প্রমাণ হিসাবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বকে আরও কার্যকর করার একটি পদক্ষেপ।

চীনের জন্য পাকিস্তানের অভিজ্ঞতাও মূল্যবান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে। চীন প্রযুক্তি, ড্রোন, নজরদারি এবং সামরিক সরঞ্জামে এগিয়ে থাকলেও পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অভিযানের অভিজ্ঞতা। ফলে দুপক্ষের সহযোগিতায় এক ধরনের পারস্পরিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। চীন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিতে পারে; পাকিস্তান মাঠপর্যায়ের অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য এবং জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারে।

Manual8 Ad Code

চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতার আঞ্চলিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার কথা ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায়। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের। লাদাখ, অরুণাচল এবং হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কাশ্মীর প্রশ্ন, সীমান্ত সংঘর্ষ এবং সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা ভারতের জন্য একটি জটিল কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরি করে।

ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় ‘টু-ফ্রন্ট চ্যালেঞ্জ’ বা দুই ফ্রন্টে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা নতুন নয়। কিন্তু চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ, অস্ত্রের সামঞ্জস্য, প্রযুক্তি বিনিময় এবং যৌথ প্রশিক্ষণ বাড়লে এই আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি আরও জোরালো হতে পারে। ভারতের উদ্বেগ শুধু এই নয় যে, পাকিস্তান চীনা অস্ত্র পাচ্ছে। বরং দুই দেশের সেনাবাহিনী যদি যৌথ কমান্ড, নজরদারি, ড্রোন পরিচালনা এবং পার্বত্য অভিযানে অভিন্ন পদ্ধতি গড়ে তোলে, তাহলে সংকটের সময় তাদের সমন্বয় করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে প্রায়ই ‘অল ওয়েদার ফ্রেন্ডশিপ’ বলা হয়। এ সম্পর্কের পেছনে ভারতের সঙ্গে দুই দেশের পৃথক বিরোধ, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামরিক নির্ভরতা, চীনের আঞ্চলিক যোগাযোগ কৌশল এবং আরব সাগর পর্যন্ত স্থলপথের প্রবেশাধিকার-সবই কাজ করে। সিপিইসি-এর মাধ্যমে চীন জিনজিয়াংকে পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান চীনের জন্য দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর হলেও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে একে অপরের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ সম্পর্ককে ‘থ্রেশহোল্ড অ্যালায়েন্স’ বা জোটের কাছাকাছি এক অংশীদারত্ব হিসাবে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ, সহযোগিতা অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে রূপ নেয়নি। এমতাবস্থায়, দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার নতুন পর্ব ‘কারাকোরাম ২০২৬’, যা শুধু চীন-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক সক্ষমতার প্রতিযোগিতাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে প্রয়াসী। ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, নির্ভুল আঘাত হানার ব্যবস্থা এবং সমন্বিত কমান্ড কাঠামো ভবিষ্যতের যুদ্ধের চরিত্র নির্ধারণ করবে। এ বাস্তবতায় সামরিক মহড়া শুধু সেনাদের শারীরিক প্রশিক্ষণ নয়। তা প্রযুক্তি, কৌশল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় যাচাইয়ের মাধ্যম।

বাংলাদেশের জন্যও এ পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ জরুরি। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির প্রধান স্বার্থ হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং সব প্রতিবেশী ও প্রধান শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদার। ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিকশিত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে কোনো একক শক্তির কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে একীভূত না করে বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।

কারাকোরাম ২০২৬-কে চীন-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় বলা যায়। এর বিশেষত্ব হলো, দুই দেশের সহযোগিতা অস্ত্র সরবরাহ ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়মিত সেনাবাহিনীর যৌথ কার্যক্রম, কমান্ড সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিনিময়ের দিকে এগোচ্ছে। তবে এই একটি মহড়া থেকেই পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট কিংবা নতুন আঞ্চলিক যুদ্ধকৌশল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে-এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যাবে না।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বড় প্রশ্ন হলো, চীন-পাকিস্তান সহযোগিতা তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে কতটা কার্যকর হবে, আর সেই সহযোগিতার প্রতিক্রিয়ায় ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা হিসাব কতটা বদলাবে? দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই শুধু কার সামরিক শক্তি কত বাড়ল, তার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলো সেই শক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিরোধ, ভারসাম্য এবং সহযোগিতার মধ্যে কীভাবে ব্যবহার করে তার ওপর।

Manual5 Ad Code

প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)

শেয়ার করুন