Beanibazarer Alo

  সিলেট     সোমবার, ২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ

admin

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০১:৪৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০১:৪৯ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ

Manual1 Ad Code

নাসির উদ্-দ্বীন:
বাংলা সাহিত্যের আকাশে কিছু নক্ষত্র থাকে, যাদের আলো সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। তাদের কেউ শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেন স্বপ্নের পৃথিবী, কেউবা পরিচিত জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অচেনা মানুষকে চিনিয়ে দেন। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন কথাশিল্পী। তার কলমে বৃষ্টি কথা বলেছে, জ্যোৎস্না হয়ে উঠেছে নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গী, আর মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ সুখ-দুঃখ পেয়েছে অসাধারণ সাহিত্যিক ব্যঞ্জনা।

তিনি শুধু গল্প লিখতেন না, গল্পের ভেতর দিয়ে মানুষের মন পড়তে জানতেন। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে এসে যেন আমাদের ঘরের মানুষ হয়ে উঠেছে। কখনো হিমুর উদাসীন পদচারণা, কখনো মিসির আলির যুক্তির অনুসন্ধান, কখনো শুভ্রর নির্মল চোখ— সব মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবন। সেই ভুবনে প্রবেশ করলে পাঠক নিজের জীবনেরই কোনো না কোনো গল্প খুঁজে পান।

একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার— বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার এমন সমন্বয় বাংলা সংস্কৃতিতে বিরল। কয়েক দশক ধরে তিনি পাঠক ও দর্শককে মুগ্ধ করেছেন। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের ভাষা ও উপস্থাপনার ধরনেও রেখে গেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর।

শৈশবের দিন, জীবনের পাঠ

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, মা আয়েশা ফয়েজ। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের নানা জনপদে। কখনো সিলেট, কখনো কুমিল্লা, কখনো বগুড়া কিংবা দিনাজপুর— বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনযাত্রা তার অভিজ্ঞতার জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই ঘুরে বেড়ানো শৈশবের স্মৃতি পরবর্তী সময়ে তার সাহিত্যে নানা রূপে ফিরে এসেছে। তার গল্পের গ্রাম, মফস্বল শহর, নদী, বৃষ্টিভেজা পথ কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারের উঠোনে যেন সেই সময়েরই ছায়া পড়ে আছে।

পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন ছোটবেলা থেকেই। ১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়নে পিএইচডি করেন।

Manual4 Ad Code

বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও তার মন পড়ে থাকত মানুষের গল্পে। মানুষের আচরণ, মনস্তত্ত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং জীবনের অদ্ভুত সব অসংগতি তাকে আকৃষ্ট করত। হয়তো বিজ্ঞান তাকে শিখিয়েছিল যুক্তির ভাষা, আর সাহিত্য দিয়েছিল সেই যুক্তির বাইরের বিস্ময়কে আবিষ্কারের সুযোগ।

‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে যাত্রা

সত্তরের দশকের শুরুতে বাংলা সাহিত্যে তার আবির্ভাব ঘটে এক নতুন ভাষাভঙ্গি নিয়ে। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। বইটি প্রকাশের পর সাহিত্যাঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং বাস্তবতার নির্মমতা তিনি এমন সহজ ভাষায় তুলে ধরেছিলেন, যা পাঠকের কাছে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।

এরপর প্রকাশিত হয় ‘শঙ্খনীল কারাগার’। এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন পাঠকের প্রিয় লেখক।

তার লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ ভাষায় গভীর কথা বলার ক্ষমতা। শব্দের বাহুল্য কিংবা দুর্বোধ্য বাক্য নির্মাণে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। বরং পরিচিত কথাবার্তা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবনের গভীরতাকে তুলে ধরতেন।

তার উপন্যাসে প্রেম এসেছে, কিন্তু তা সব সময় প্রচলিত প্রেমের গল্প হয়ে ওঠেনি। সেখানে বিচ্ছেদ আছে, অপেক্ষা আছে, অভিমান আছে, আবার আছে অদ্ভুত সব মানবিক সম্পর্ক। কখনো একটি অসমাপ্ত সংলাপ, কখনো জানালার বাইরে বৃষ্টি, কখনো নিঃশব্দে বসে থাকা কোনো মানুষ— এসবের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেতেন গল্পের উপাদান।

‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘কবি’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’ ও ‘লীলাবতী’ তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, প্রেম, পরিবার, মনস্তত্ত্ব এবং সামাজিক বাস্তবতা— বিভিন্ন বিষয় তার লেখায় স্বতন্ত্র মাত্রা পেয়েছে।

চরিত্রের ভেতর অন্য এক পৃথিবী

একজন লেখক তার সৃষ্ট চরিত্রের মধ্য দিয়েই দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেন। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে কথাটি বিশেষভাবে সত্য।

হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমুর কথা মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক উদাসীন তরুণের ছবি। খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটছে, মানুষের আচরণ দেখছে, কখনো অদ্ভুত কথা বলছে, আবার কখনো এমন কোনো প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, যার উত্তর সহজে মেলে না। হিমু যেন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে জীবনকে দেখার এক নিজস্ব দর্শন।

অন্যদিকে মিসির আলি একেবারেই ভিন্ন। তিনি যুক্তিবাদী, অনুসন্ধিৎসু এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন। কোনো রহস্যময় ঘটনা কিংবা অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা খুঁজে বের করাই তার আগ্রহ। হিমু যেখানে রহস্যকে উপভোগ করে, মিসির আলি সেখানে রহস্যের সমাধান খোঁজেন।

আর শুভ্র— তার মধ্যে রয়েছে সরলতা, সংবেদনশীলতা ও নির্মল মানবিকতা। এই তিনটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মানুষের মনোজগতের তিনটি আলাদা দিককে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন।

তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো এতটাই জীবন্ত যে, অনেক পাঠক কখনো কখনো তাদের বাস্তব মানুষ বলেই ভাবতে ভালোবাসেন। এটাই একজন কথাশিল্পীর বড় সাফল্য।

ছোট পর্দায় বড় ভালোবাসা

সাহিত্যের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করেছিলেন এক নতুন জগৎ। আশির দশকে তার নাটক দর্শকদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের পরিচিত জীবন, হাসি-কান্না, প্রেম, অভিমান, সামাজিক অসংগতি এবং মানুষের বিচিত্র আচরণ তার নাটকের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে।

‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘নক্ষত্রের রাত’ এবং ‘আজ রবিবার’— প্রতিটি নাটকই দর্শকদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

‘এইসব দিনরাত্রি’তে একটি পরিবারের প্রতিদিনের জীবন যেন দর্শকের নিজের পরিবারের গল্প হয়ে উঠেছিল। ‘বহুব্রীহি’তে হাস্যরসের আড়ালে তিনি সমাজের নানা অসংগতি ও মানুষের সংকীর্ণতাকে তুলে ধরেছিলেন। আর ‘অয়োময়’তে ঐতিহাসিক পটভূমির মধ্য দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন ভিন্ন এক নাট্যজগৎ।

তবে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটি যেন এক আলাদা ইতিহাস। নাটকের একটি কাল্পনিক চরিত্রের জন্য দর্শকের এমন আবেগ, এমন প্রতিবাদ বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। বাকের ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে দর্শকদের প্রতিবাদ, মিছিল ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ প্রমাণ করেছিল— হুমায়ূন আহমেদ শুধু গল্প বলতে জানতেন না, মানুষের অনুভূতিকে গভীরভাবে স্পর্শ করতেও জানতেন।

চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও মানুষের গল্প

টেলিভিশনের পর বড় পর্দায়ও নিজের সৃজনশীলতার পরিচয় দেন তিনি। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, সাহস, ভয় ও আত্মত্যাগের গল্প উঠে এসেছে।

এরপর নির্মাণ করেন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তার নিজস্ব গল্প বলার ধরন ও দৃশ্য নির্মাণের দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে গ্রামীণ জীবন, লোকসংগীত ও প্রেমের এক অপূর্ব আবহ তৈরি করেছিলেন তিনি। ‘শ্যামল ছায়া’য় মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ বাস্তবতা এবং মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন। আর ‘ঘেটুপুত্র কমলা’য় সমাজের এক অন্ধকার বাস্তবতাকে সাহসের সঙ্গে পর্দায় নিয়ে আসেন।

তার নির্মিত ‘শ্যামল ছায়া’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মনোনীত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য অর্জন।

প্রকৃতি, সংগীত ও নুহাশ পল্লী

হুমায়ূন আহমেদের জীবনে প্রকৃতির একটি বিশেষ স্থান ছিল। তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে বৃষ্টি, জ্যোৎস্না, নদী, গাছপালা কিংবা নিস্তব্ধ রাত বারবার ফিরে এসেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে তিনি শুধু দৃশ্য হিসেবে দেখেননি, মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

গাজীপুরের পিরুজালীতে গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের ঠিকানা ‘নুহাশ পল্লী’। সবুজ গাছপালা, জলাশয়, ভাস্কর্য ও নির্জন পরিবেশে সাজানো এই স্থান ছিল তার প্রিয় আশ্রয়। সেখানে তিনি কখনো লিখেছেন, কখনো প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, আবার কখনো নিজের মতো করে নিভৃতে থেকেছেন।

Manual1 Ad Code

সংগীতেও ছিল তার গভীর আগ্রহ। তার নাটক ও চলচ্চিত্রের গানগুলো আজও শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে। ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’সহ তাঁর চলচ্চিত্রের বেশ কিছু গান লোকজ সুর ও আধুনিক অনুভূতির মেলবন্ধনে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

স্বীকৃতি ও সম্মান

সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৯৪ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অর্জন করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ নানা স্বীকৃতি।

তবে তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল পাঠকের ভালোবাসা। বইমেলায় তার নতুন বই প্রকাশের অপেক্ষা, বইয়ের দোকানে পাঠকের ভিড় কিংবা টেলিভিশনে তার নাটক প্রচারের সময় ঘরে ঘরে দর্শকের আগ্রহ— এসবই ছিল তার জনপ্রিয়তার অনন্য প্রমাণ।

তার সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। সাহিত্যিক মান, জনপ্রিয়তা এবং লেখার ধরন নিয়ে নানা মতও রয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষার বিপুলসংখ্যক মানুষকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

শেষ বিকেলের আলো

জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে কঠিন অসুস্থতার মুখোমুখি হন হুমায়ূন আহমেদ। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই জনপ্রিয় কথাশিল্পী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। পরে গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে তাকে সমাহিত করা হয়।

Manual6 Ad Code

তার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। পাঠক হারান তাদের প্রিয় লেখককে, দর্শক হারান প্রিয় নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতাকে। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল মানুষের চলে যাওয়া মানেই কি তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি?

হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে তা নয়। তার বইয়ের পাতায় আজও হিমু হাঁটে, মিসির আলি রহস্যের সমাধান খোঁজেন, শুভ্র তার নির্মল চোখে পৃথিবীকে দেখে। কোনো এক বর্ষার দুপুরে পাঠক হয়তো আবার খুলে বসেন তার পুরোনো কোনো উপন্যাস। টেলিভিশনের পর্দায় পুরোনো নাটক দেখলে ফিরে আসে সেই চেনা সংলাপ, সেই চেনা আবেগ।

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান কেবল অসংখ্য বই কিংবা নাটক-চলচ্চিত্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। সহজ ভাষায় গভীর অনুভূতি প্রকাশের যে নিজস্ব পথ তৈরি করেছিলেন, তা বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।

Manual5 Ad Code

সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচি বদলায়, নতুন লেখক আসেন, নতুন সাহিত্যধারা তৈরি হয়। তবু কিছু লেখকের আবেদন মুছে যায় না। হুমায়ূন আহমেদ তেমনই একজন। তার সৃষ্টির ভেতরে রয়েছে আমাদের চেনা মানুষ, পরিচিত সমাজ, ভালোবাসা, অভিমান, নিঃসঙ্গতা এবং জীবনের অদ্ভুত সব গল্প।

তিনি আজ নেই। কিন্তু বৃষ্টির শব্দে, জ্যোৎস্নার আলোয়, নিঃসঙ্গ কোনো বিকেলে কিংবা বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি ফিরে আসেন। পাঠক যখন তার লেখা পড়েন, তখন মনে হয়, মানুষটি যেন খুব কাছেই কোথাও বসে আছেন— নতুন কোনো গল্পের কথা ভাবছেন।

কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ তাই কেবল একটি নাম নন; তিনি বাংলা ভাষার পাঠকের ভালোবাসায় বেঁচে থাকা এক অনিবার্য সাহিত্যিক উপস্থিতি।

শেয়ার করুন