Beanibazarer Alo

  সিলেট     বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ  | ৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তৈলের বিপদ হইতে শিক্ষা লইতে হইবে

admin

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৪:০৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ | ০৪:০৫ অপরাহ্ণ

ফলো করুন-
জ্বালানি তৈলের বিপদ হইতে শিক্ষা লইতে হইবে

Manual7 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার:

বিশ্ব এখন বিশ্বগ্রাম। সেই কারণে ভূগোলের মানচিত্রে হাজার মাইল দূরে সংঘটিত সংঘর্ষ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সরবরাহ-ব্যবস্থাকে নাড়াইয়া দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের সংঘাতের ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা বাংলাদেশের জন্য তেমনই এক বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করিতেছে। যুদ্ধ আমাদের দেশের মাটিতে ঘটিতেছে না; কিন্তু তাহার অভিঘাত ইতিমধ্যেই আমাদের জীবনে পৌছাইতে শুরু করিয়াছে।মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়াই বিপুল পরিমাণ তৈল ও গ্যাস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়; কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই পথের নিরাপত্তা যখন বিঘ্নিত হয়, তখন শুধু সংশ্লিষ্ট অঞ্চলই নহে-বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যস্ত হইতে শুরু করে। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশেও জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হইয়াছে।

সরকার ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কিছু জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে। জ্বালানি তৈলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হইয়াছে, পেট্রোল পাম্পে বরাদ্দ কমানো হইয়াছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহও সীমিত করা হইয়াছে। ইহার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার হইতে এলএনজি ও পরিশোধিত তৈল সংগ্রহের জন্য বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের প্রচেষ্টাও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুসারে দেশে বর্তমানে সীমিত সময়ের জন্য জ্বালানি মজুত রহিয়াছে-ডিজেল প্রায় দুই সপ্তাহ, পেট্রোল ও অকটেন কিছুটা বেশি সময়, আর ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের মজুত অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করিয়া দেয় যে পরিস্থিতি এখনো বিপর্যস্ত পর্যায়ে পৌঁছায় নাই; কিন্তু সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করিবার উপায়ও নাই।

Manual4 Ad Code

তবে সংকটের প্রকৃত উৎস কেবল সরবরাহের ঘাটতি নহে, বহু ক্ষেত্রে আতঙ্কও সংকটকে ত্বরান্বিত করে। রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য মূলত ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার ভয়ে মানুষের অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রবণতার ফল। অর্থনীতির ভাষায় যাহাকে বলা হয় ‘প্যানিক বায়িং’। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই প্রবণতা যে কোনো সংকটকে বাস্তবের তুলনায় বহু গুণ তীব্র করিয়া তুলিতে পারে। এই কারণেই রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকটের কালে সংযমই হইতে পারে সর্বাপেক্ষা কার্যকর প্রতিরক্ষা। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত পরিহার, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে মিতব্যয়িতা-এই সাধারণ অভ্যাসগুলিই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতে পারে।

Manual8 Ad Code

সরকারি দপ্তরসমূহে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য যে নির্দেশনা জারি করা হইয়াছে-প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় বাতি ও যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা, এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখা-এই পদক্ষেপগুলি কেবল প্রশাসনিক নিয়ম নহে, বরং একটি প্রয়োজনীয় মানসিকতার প্রতিফলন। রাষ্ট্র যখন সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তখন তাহা নাগরিক সমাজের মধ্যেও একধরনের সচেতনতা সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যেই করা হয়।

Manual7 Ad Code

তবে এই সংকট আমাদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরিয়া আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির সামান্য অস্থিরতাও যখন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করিতে পারে, তখন প্রশ্ন উঠিয়াই যায়-আমরা কি বিকল্প শক্তির উৎস অনুসন্ধানে যথেষ্ট মনোযোগ দিতেছি? নবায়নযোগ্য শক্তি, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি কিংবা আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রগুলিতে অধিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা এখন আর বিলাসিতা নহে, বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।

Manual2 Ad Code

ইতিহাসে বহুবার দেখা গিয়াছে-সংকট কেবল দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, ইহার পাশাপাশি নূতন পথের সন্ধানও দেয়। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের সামনে সেই সুযোগই উপস্থিত করিয়াছে। যদি আমরা এই মুহূর্তকে কেবল সাময়িক বিপদ বলিয়া উপেক্ষা করি, তাহা হইলে ভবিষ্যতের বৃহত্তর সংকটের জন্য ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির এই শিক্ষা হেলায় নষ্ট করিব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হইল ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আর নাগরিকের দায়িত্ব হইল, সময় সংযম ও সচেতনতার মাধ্যমে এই ধরনের আপৎকালীন সমস্যা মোকাবিলায় সরকারকে সহযোগিতা করা।

শেয়ার করুন